পর্বত মানেই রোমাঞ্চ, চ্যালেঞ্জ আর সীমাহীন টান। কিন্তু সেই টান অনেক সময় বদলে যায় নিঃশব্দ ট্র্যাজেডিতে। পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খোঁজ আজও বিশ্বের অন্যতম কঠিন উদ্ধার অভিযানগুলোর একটি। তুষারধস, দুর্যোগ, দুর্গম পথ—সব মিলিয়ে অনেক সময় মানবচেষ্টা থমকে যায়। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এবার সেই খোঁজে নতুন আশার নাম—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
সম্প্রতি ইতালির আল্পস পর্বতমালায় ঘটে যাওয়া এক ঘটনা গোটা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। দক্ষ পর্বতারোহী ও পেশায় অর্থোপেডিক সার্জন নিকোলা ইভালদো ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আল্পসের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত ১২,৬০২ ফুট উচ্চতার ‘মনভিসো’ শৃঙ্গ অভিযানে বেরিয়েছিলেন। পাহাড়ে ওঠা ছিল তাঁর নেশার মতোই, যেমনটা ছিল বাংলার পর্বতারোহী ছন্দা গায়েনের।
মনভিসোর যাত্রাপথ অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল। বিভিন্ন দিক থেকে এই শৃঙ্গ আরোহন করা যায়, কিন্তু প্রতিটি পথেই রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। এমনই এক দুর্গম বাঁকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান নিকোলা। শুরু হয় ব্যাপক তল্লাশি। হেলিকপ্টার থেকে পাহাড় চষে ফেলা হয়, একাধিক অনুসন্ধান দল কাজ শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে আল্পস জুড়ে শুরু হয় প্রবল তুষারপাত। অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হন উদ্ধারকারীরা।
তুষারপাত থামার পর ফের শুরু হয় অনুসন্ধান। কিন্তু এবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত একাধিক ড্রোন পাঠানো হয় পাহাড়ের আকাশে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ওই ড্রোনগুলো বরফে ঢাকা পাহাড়ের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে। সেই ফুটেজ পাঠানো হয় এআই ল্যাবে বিশ্লেষণের জন্য।
বরফে ঢাকা পাহাড়ে একটি মানুষের উপস্থিতির চিহ্ন খুঁজে বের করা কার্যত খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতো। কিন্তু এখানেই এআই-এর শক্তি। ড্রোন থেকে পাওয়া প্রতিটি ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিল নিখুঁত অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের তথ্য। সেই ডেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়েই নজরে আসে একটি অস্বাভাবিকতা—একটি নির্দিষ্ট স্থানের ছবি আশপাশের প্রাকৃতিক গঠনের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
এই সূত্র ধরেই শুরু হয় গভীর বিশ্লেষণ। শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাতেই খোঁজ মেলে নিকোলার হেলমেটের। এরপর উদ্ধারকারীরা নিশ্চিত হন, এটাই তাঁর শেষ অবস্থান। এআই-এর চোখ না থাকলে হয়তো এই চিহ্ন কোনোদিনই ধরা পড়ত না।
এই ঘটনা নতুন করে মনে করিয়ে দেয় বাংলার পর্বতারোহী ছন্দা গায়েনের কথা। ২০১৪ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা জয়ের পর ‘ইয়াংলু কান’ শৃঙ্গে একক অভিযানে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন। তুষারধসে হারিয়ে যান পাহাড়ের কোলে। একাধিক অনুসন্ধান সত্ত্বেও আজ ১১ বছরেও তাঁর দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন উঠছেই—এই প্রযুক্তি যদি তখন থাকত? আজ যে এআই ড্রোন বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা হেলমেট খুঁজে দিতে পারে, আগামী দিনে কি সে খুঁজে দেবে বাংলার মেয়ে ছন্দা গায়েনকেও? নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে একথা বলাই যায়, পাহাড়ের নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খোঁজে এবার মানবচেষ্টার পাশে দাঁড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর সেখানেই জন্ম নিচ্ছে নতুন আশা।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.