এক মাসেরও কম সময়ে জীবনের দু’টি গভীর ক্ষত—প্রথমে বাবার প্রয়াণ, তারপর বোনের আকস্মিক মৃত্যু। এমনই চরম ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন বিশিষ্ট প্লেব্যাক গায়িকা ও অভিনেত্রী চিত্রা আইয়ার। ওমানের জেবেল শামস অঞ্চলে ট্রেকিং করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর বোন শারদা আইয়ারের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় শুধু পরিবার নয়, শোকস্তব্ধ শিল্পীমহলও।
বোনের মৃত্যুর কয়েকদিন পর চিত্রা আইয়ার নিজের আবেগ আর যন্ত্রণার কথা উজাড় করে দেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ইনস্টাগ্রামে শারদার বিভিন্ন অভিযানের ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন এক হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণা। সেই লেখায় কখনও হালকা স্মৃতির ছোঁয়া, কখনও গভীর বেদনার সুর। চিত্রা লেখেন, ফোনের ওপার থেকে শারদার অবিরাম কথা, পাশের ঘর থেকে তাঁর চেঁচামেচি কিংবা সেই ‘বিরক্তিকর’ উপস্থিতি ছাড়া জীবন যে কতটা শূন্য হয়ে যাবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না। আদরের সুরে তিনি বলেন, শারদা শুধু তাঁর বোন নন—তিনি ছিলেন এক জীবন্ত অনুভূতি। পোস্টের শেষদিকে তিনি নিজেকেই প্রতিশ্রুতি দেন, বোনের সঙ্গে তিনি আবার “শীঘ্রই মিলিত হবেন।”
এই শোকের আবহে আবেগঘন বার্তা দেন চিত্রার কন্যা, জনপ্রিয় অভিনেত্রী অঞ্জলি শিবরমনও। প্রিয় মাসির উদ্দেশে লেখা নোটে অঞ্জলি জানান, এই শোক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, শারদা শুধু মাসি ছিলেন না, তিনি ছিলেন মা, বন্ধু, অভিভাবক এবং জীবনের সবচেয়ে বড় সমর্থক। তাঁর চলে যাওয়ায় যেন পৃথিবীটাই ঠিকঠাক নেই। ভবিষ্যতের অজস্র পরিকল্পনা, হাসি আর স্মৃতি অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার আক্ষেপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে অঞ্জলির লেখায়।
গাল্ফ নিউজ সূত্রে জানা যায়, ৫৫ বছর বয়সি শারদা আইয়ার মাস্কাটে বসবাসকারী একজন ভারতীয় প্রবাসী ছিলেন। গত ২ জানুয়ারি বন্ধুদের সঙ্গে ওমানের জেবেল শামস এলাকায় ট্রেকিং করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়। কেরালার কোল্লাম জেলার করুণাগাপ্পালির থাজাভায় জন্ম শারদার। কর্মজীবনে তিনি ওমান এয়ারে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন।
চিত্রা ও শারদা দু’জনেই প্রয়াত কৃষি বিজ্ঞানী ড. আরডি আইয়ার এবং ড. রোহিণী আইয়ারের কন্যা। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ১১ ডিসেম্বর ড. আরডি আইয়ারের মৃত্যু হয়। বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে শারদা তখন ভারত এসেছিলেন এবং পরে আবার ওমানে ফিরে যান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাবার মৃত্যুর এক মাসের মধ্যেই পরিবারের উপর নেমে আসে দ্বিতীয় এই ভয়াবহ শোক। শারদার মরদেহ বর্তমানে কেরালায় আনা হচ্ছে এবং ৭ জানুয়ারি থাজাভায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
চিত্রা আইয়ার অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছেন। মালায়ালাম ও তামিল সিনেমায় তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন একাধিক সিনেমা ও টেলিভিশন সিরিজে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে দেখা গেছে স্ট্রিমিং সিরিজ মনোরথাঙ্গল-এর “বিল্পনা” অধ্যায়ে।
ব্যক্তিগত জীবনের এই গভীর ক্ষতি চিত্রা আইয়ার ও তাঁর পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল। শিল্পী হিসেবে যিনি লক্ষ মানুষের অনুভূতিতে সুর তুলেছেন, আজ তিনিই নিজের জীবনের সবচেয়ে নিঃশব্দ বেদনার মুখোমুখি।