হিন্দু ধর্মে দেবী কালীর আরাধনার গুরুত্ব অপরিসীম। সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন অমাবস্যায় কালীপুজো অনুষ্ঠিত হলেও, একটি পুজো রয়েছে যা তিথিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম—রটন্তী কালী পুজো। এই পুজো অমাবস্যায় নয়, মাঘ মাসের চতুর্দশী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় বলেই এর মাহাত্ম্য আলাদা।
২০২৬ সালে রটন্তী কালী পুজো পড়েছে ১৮ জানুয়ারি, রবিবার। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি ৪ মাঘ। চতুর্দশী তিথি শুরু হবে ১৭ জানুয়ারি রাত ১২টা ১৪ মিনিট থেকে এবং শেষ হবে ১৮ জানুয়ারি রাত ১টা ৩০ মিনিটে। এই সময়ের মধ্যেই নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করা হয়।
রটন্তী কালী পুজো উপলক্ষে রাজ্যের বিভিন্ন কালীমন্দিরে বিশেষ আয়োজন করা হয়। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে এই পুজো অত্যন্ত ধুমধাম করে পালিত হয়। সারা বছরে দক্ষিণেশ্বরে তিনটি বড় কালীপুজোর মধ্যে একটি হল রটন্তী কালী পুজো। এদিন শুধু মন্দির প্রাঙ্গণ নয়, দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গার ঘাটেও বহু পুণ্যার্থী ভোরবেলায় পুণ্যস্নান করতে আসেন।
রটন্তী কালী পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের একটি প্রসিদ্ধ উক্তি। কথিত আছে, তিনি বলেছিলেন—রটন্তী কালী পুজোর ভোরে তিনি দেখেছিলেন, স্বর্গের দেবতারা দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গায় নেমে স্নান করছেন। এই বিশ্বাস থেকেই আজও অসংখ্য ভক্ত রটন্তীর ভোরে গঙ্গাস্নানকে অত্যন্ত পুণ্য বলে মনে করেন। দক্ষিণেশ্বর ছাড়াও কালীঘাট ও অন্যান্য শক্তিপীঠে এদিন দেবীর প্রতিমা বিশেষ সাজে সজ্জিত হয়।
‘রটন্তী’ শব্দটির উৎপত্তি ‘রটনা’ থেকে, যার অর্থ সর্বত্র প্রচার হওয়া। বিশ্বাস করা হয়, এই তিথিতেই দেবী কালীর মহিমা চতুর্দিকে রটে যায়। মুক্তকেশী মায়ের শক্তি ও কৃপা এই দিনে সর্বস্তরে প্রকাশিত হয় বলেই এই নামকরণ।
লোককথা অনুসারে, এই বিশেষ দিনেই দেবী ছিন্নমস্তার আবির্ভাব হয়েছিল। দেবী পার্বতী তাঁর সহচরীদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য নিজের মুণ্ডুচ্ছেদ করে ত্রিধারায় রক্ত প্রবাহিত করেছিলেন—এই আত্মত্যাগ ও শক্তির স্মরণেই দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
শাস্ত্রমতে, শ্রীকৃষ্ণের প্রেমলীলার সঙ্গে রটন্তী তিথির এক গভীর যোগ রয়েছে। একদিন দুপুরে গোপিনীরা কৃষ্ণের বাঁশির সুর শুনে বনে ছুটে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন—শ্রীরাধাই স্বয়ং আদ্যাশক্তি। সেই উপলব্ধির স্মরণেই এই বিশেষ চতুর্দশী তিথিতে রটন্তী কালী পুজোর প্রচলন।
বিশ্বাস অনুযায়ী, যাঁদের দাম্পত্য জীবনে কলহ রয়েছে, যাঁরা প্রেমভঙ্গ বা পারিবারিক অশান্তিতে ভুগছেন, তাঁদের জন্য রটন্তী কালী পুজো অত্যন্ত ফলদায়ক। নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করলে দাম্পত্য সুখ, মানসিক শান্তি ও জীবনের জটিলতা কাটে বলে ভক্তদের বিশ্বাস।
এই কারণেই রটন্তী কালী পুজো শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বিশ্বাস, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলন।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.