সনাতন ধর্মে একাদশী তিথি ভগবান বিষ্ণুর আরাধনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। সারা বছরে মোট ২৪টি একাদশী পালিত হয়, যার প্রতিটিরই আলাদা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষে পালিত বিজয়া একাদশী বিশেষভাবে ফলদায়ক ও পুণ্যময় বলে মানা হয়। নাম অনুসারেই এই তিথি জীবনে বিজয়, সাফল্য এবং বাধা থেকে মুক্তির বার্তা বহন করে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তিভরে বিজয়া একাদশী উপবাস পালন করলে জীবনের নানা সংগ্রাম, শত্রুবাধা ও মানসিক অশান্তি দূর হয় এবং ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
বিজয়া একাদশী ২০২৬: তারিখ ও শুভ সময়
২০২৬ সালে বিজয়া একাদশী পালিত হবে ১৩ ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার।
একাদশী তিথি শুরু: ১২ ফেব্রুয়ারী, রাত ১২:২২ মিনিটে
একাদশী তিথি শেষ: ১৩ ফেব্রুয়ারী, দুপুর ২:৫৫ মিনিটে
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী উদয়তিথি গ্রহণযোগ্য হওয়ায় ১৩ ফেব্রুয়ারী উপবাস পালন করা হবে।
উপবাস ভঙ্গ (পারণ) করা হবে ১৪ ফেব্রুয়ারী, সকাল ৭:২৩ মিনিট থেকে ৯:২১ মিনিটের মধ্যে।
ধর্মীয় তাৎপর্য
শাস্ত্রমতে বিজয়া একাদশী সকল পাপ নাশকারী। এটি শুধু বর্তমান জীবনের নয়, পূর্বজন্মের পাপ থেকেও মুক্তি প্রদান করে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই তিথি পালন করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ—এই চার পুরুষার্থ লাভের পথ সুগম হয়।
বিশ্বাস করা হয়, জীবনে বারবার ব্যর্থতা, শত্রুর প্রতিবন্ধকতা, ভয় ও দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে বিজয়া একাদশী অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
পুরাণোক্ত কাহিনী
পদ্ম পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণে বিজয়া একাদশীর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। কাহিনী অনুযায়ী, ভগবান রাম লঙ্কা জয়ের আগে এই উপবাস পালন করেছিলেন। এর ফলেই তিনি রাবণের উপর বিজয়ী হন।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই দিনে উপবাস করলে সোনা, জমি, খাদ্য ও গরু দানের সমান পুণ্য লাভ হয়। এমনকি ‘বাজপেয় যজ্ঞ’-এর সমতুল্য পুণ্যও প্রাপ্ত হয়।
বিজয়া একাদশী পূজা পদ্ধতি
ব্রহ্ম মুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে স্নান করুন।
পরিষ্কার, বিশেষত হলুদ বস্ত্র পরিধান করুন।
ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন।
তুলসী পাতা, হলুদ ফুল, ফল, ধূপ, প্রদীপ ও চন্দন নিবেদন করুন।
উপবাসের সংকল্প গ্রহণ করুন।
বিজয়া একাদশীর ব্রতকথা শ্রবণ করুন এবং আরতি করুন।
রাত্রে বিষ্ণু নাম জপ ও স্তবগান করুন।
উপবাসের নিয়ম
ভাত ও ভারী খাবার পরিহার করুন।
কালো পোশাক এড়িয়ে চলুন।
পরনিন্দা, ক্রোধ, ছলনা ও হিংসা থেকে বিরত থাকুন।
দিনভর সৎকর্ম ও ঈশ্বরচিন্তায় মনোনিবেশ করুন।
দানের বিশেষ গুরুত্ব
কলিযুগে দান সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্য হিসেবে বিবেচিত। বিজয়া একাদশীর মতো পবিত্র দিনে অন্ন, বস্ত্র, অর্থ ও গরু দান বিশেষ ফলদায়ক। দরিদ্র, অসহায় ও অভাবী মানুষদের খাদ্যদান সর্বোত্তম দান হিসেবে গণ্য হয়।
মনুস্মৃতি অনুযায়ী—
সত্যযুগে তপস্যা, ত্রেতায় জ্ঞান, দ্বাপরে যজ্ঞ এবং কলিযুগে দানই মানবকল্যাণের প্রধান পথ।
তাই এই শুভ তিথিতে অন্ন ও শস্য দান, অসহায় শিশুদের আহার করানো এবং সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্যতম উপায়।
বিজয়া একাদশী কেবল একটি উপবাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সৎকর্ম ও দানের মাধ্যমে জীবনে সত্যিকারের বিজয় অর্জনের এক পবিত্র সুযোগ। ভক্তিভরে পালন করলে জীবনের অন্ধকার দূর হয়ে শান্তি ও সাফল্যের পথ প্রশস্ত হয়।