নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রহস্যময় অন্তর্ধান ও মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সেই বিতর্কে ফের একবার নতুন মাত্রা যোগ হল, যখন ১৯৫৬ সালের একটি তাইওয়ান তদন্ত রিপোর্ট সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দপ্তরে জমা পড়ল। রিপোর্টটির মূল বক্তব্য—১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকু (বর্তমান তাইপে) শহরে কোনও বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি। ফলে ওই তথাকথিত দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এই রিপোর্টটি প্রকাশ্যে এনেছেন পশ্চিমবঙ্গের দুই গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ সরকারের আর্কাইভে সংরক্ষিত এই নথি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যে দুর্ঘটনার কথা বলে নেতাজির মৃত্যু ঘোষণা করা হয়, তা আদৌ ঘটেনি। অথচ এতদিন ভারত সরকার এই রিপোর্ট উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি।
সম্প্রতি জাপানের রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত চিতাভস্মকে নেতাজির বলে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি নতুন করে জোরদার হয়েছে। নিজেকে নেতাজির কন্যা বলে দাবি করা অনিতা পাফ গত বছরই এই চিতাভস্ম ফেরানোর আবেদন জানান। একই দাবিতে সম্প্রতি বসু পরিবারের সদস্য, শরৎচন্দ্র বসুর নাতি ও প্রাক্তন বিজেপি নেতা চন্দ্র বসু রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখেছেন। তাঁর আবেদন, ২৩ জানুয়ারি নেতাজির ১২৯তম জন্মদিনের আগেই যেন ওই চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
এই আবহেই সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত রাষ্ট্রপতি ভবনে ১৯৫৬ সালের তাইওয়ান রিপোর্টের কপি পাঠান। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও রিপোর্টের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রমাণিত সত্য সামনে থাকা সত্ত্বেও যদি ভ্রান্ত দাবি ও আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে ইতিহাস বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কয়েক মাস আগে কলকাতায় চন্দ্র বসুর সঙ্গে এই দুই গবেষকের আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনায় চন্দ্র বসু দাবি করেন, ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু সংক্রান্ত ‘প্রামাণ্য নথি’ তাঁর কাছে রয়েছে। তখনই পাল্টা হিসেবে তাইওয়ান রিপোর্টের কথা তুলে ধরেন সৈকত ও সৌম্য। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, ওই রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে—তাইওয়ানে কোনও বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি। সেই রিপোর্ট চন্দ্র বসুকে পাঠানোও হয়েছিল বলে জানান গবেষকেরা।
সৈকত নিয়োগীর কথায়, “নেতাজিকে নিয়ে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অন্য কারও চিতাভস্ম এনে তাঁকে নেতাজি বলে চালানোর ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রপতির দপ্তরে সত্যিটা জানালাম।” অন্যদিকে সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত বলেন, “যেখানে প্রমাণিত তথ্য সামনে রয়েছে, সেখানে মিথ্যা দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায় রয়েছে।”
সব মিলিয়ে, নেতাজির মৃত্যু রহস্য ও রেনকোজি চিতাভস্ম বিতর্কে এই তাইওয়ান রিপোর্ট নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল। এখন দেখার, রাষ্ট্রপতির দপ্তর ও কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রমাণের ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়।