উত্তর দিনাজপুর জেলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন করে প্রাণ পেতে চলেছে। প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া বিন্দোল এলাকার কাঞ্চন নদীর পাড়ে অবস্থিত সুপ্রাচীন ভৈরবী মন্দিরকে আবার তার আদি রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। সুলতানি আমলের এই মন্দির সংস্কারের জন্য রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ৬৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য সংরক্ষণে এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদরা।
প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে নির্মিত এই ভৈরবী কালী মন্দির সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। নদীপথের পরিবর্তন, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় মন্দিরের মূল কাঠামো প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। তবে উত্তর দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের তৎপরতায় নতুন করে শুরু হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের পুনরুদ্ধার কাজ।
সম্প্রতি রায়গঞ্জ শহরের অদূরে অবস্থিত ভৈরবী মন্দির এলাকা পরিদর্শন করেন আর্কিওলজি বিভাগের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তাঁরা মন্দিরের ভিতর ও বাইরের স্থাপত্য, টেরাকোটা অলঙ্করণ, ইটের ধরন এবং চুন-সুরকির ব্যবহার খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মন্দিরটিকে হুবুহু আদি আদলে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে।
জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের আধিকারিক শুভম চক্রবর্তী জানান, “রাজ্য সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তরফে প্রায় ৬৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জেলাশাসকের তত্ত্বাবধানে পূর্ত দপ্তরের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।”
চতুর্দশ শতকের শেষভাগে নির্মিত এই টেরাকোটা মন্দিরে কালো পাথরের ভৈরবী কালী মূর্তি স্থাপিত ছিল। সংস্কারের ক্ষেত্রে মন্দিরের মূল ঐতিহ্য ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য রায়গঞ্জ আর্কিওলজি দপ্তরের প্রধান প্রতিনিধি রানা দেবদাস, জেলার পূর্ত দপ্তরের কার্যনির্বাহী বাস্তুকার, জেলা ও ব্লক প্রশাসনের আধিকারিক এবং মন্দির কমিটির সদস্যদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও হেরিটেজ কমিশনের (উত্তরবঙ্গ) সদস্য ইতিহাসবিদ আনন্দগোপাল ঘোষ জানান, “সুলতানি আমলে ভাতুরিয়া জমিদার গনেশ নারায়ণ ছিলেন শিবভক্ত। তাঁর উদ্যোগেই বাংলাদেশ থেকে বয়ে আসা কাঞ্চন নদীর পাড়ে এই ভৈরবী কালী মন্দির নির্মিত হয়। কার্বন পরীক্ষার মাধ্যমে সেই সময়ের ইট, চুন ও সুরকির ধরন চিহ্নিত করে অবিকল আদলের মন্দির ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
সংস্কারের পর মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে ডিরেক্টরেট অফ আর্কিওলজি অ্যান্ড মিউজিয়াম দপ্তরের হাতে। প্রশাসনের আশা, মন্দিরের হারানো গৌরব ফিরে এলে কাঞ্চন নদীপাড়ের এই অঞ্চল নতুন করে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা নেবে।