হিন্দু ধর্মে জীবনের প্রতিটি পর্যায় নির্দিষ্ট আচার ও বিধিনিষেধের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জন্ম থেকে মৃত্যু—সব কিছুরই আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত ১৬টি সংস্কারের মধ্যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা শেষকৃত্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র আচার। এই আচারটির মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির দেহ দাহ করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে দেহ পাঁচটি মহাভূতের সঙ্গে মিলিত হয়ে আত্মা তার পরবর্তী যাত্রার পথে অগ্রসর হয়।
গরুড় পুরাণ অনুসারে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং আত্মার শান্তি ও মুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই সময় শ্মশানে বা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে শান্ত, সংযত ও পবিত্র পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই কারণেই শাস্ত্রে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গর্ভবতী মহিলারা
গরুড় পুরাণে বলা হয়েছে, গর্ভবতী মহিলাদের শ্মশান বা শেষকৃত্যে যাওয়া অনুচিত। শোক, কান্না ও মানসিক চাপপূর্ণ পরিবেশ গর্ভবতী নারীর মানসিক অবস্থার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। শাস্ত্র মতে, শ্মশানে নেতিবাচক শক্তির প্রভাব থাকে, যা অনাগত সন্তানের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিয়ের পর এক বছরের মধ্যে বিবাহিতরা
বাঙালি হিন্দু সমাজে বিয়ের পর এক বছরের মধ্যে শোকের বাড়িতে বা শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে যাওয়া নিষেধ। বিয়ে একটি শুভ ও আনন্দময় অনুষ্ঠান হওয়ায়, তার পরপরই শোকের পরিবেশে যাওয়া অশুভ বলে মনে করা হয়।
ছোট শিশুরা
গরুড় পুরাণ অনুসারে, ছোট বাচ্চাদের শ্মশান বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। জ্বলন্ত চিতা, মানুষের কান্না ও শোকের পরিবেশ শিশুদের মনে ভয়, আতঙ্ক ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
অসুস্থ ও হৃদরোগী ব্যক্তি
যাঁরা শারীরিকভাবে অসুস্থ বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাঁদের শেষকৃত্যে যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শোকের আবহ ও মানসিক চাপ তাঁদের শারীরিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
যাঁদের বাড়িতে ইতিমধ্যেই শোক চলছে
গরুড় পুরাণ অনুযায়ী, যদি কারও পরিবারে সম্প্রতি মৃত্যু ঘটে থাকে এবং তাঁরা শোকাচরণে রয়েছেন, তবে তাঁদের অন্য কোনও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান করা উচিত নয়। শোকের সময় ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ব্যক্তিরা
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য আত্মার শান্তি কামনা। অতিরিক্ত কান্না বা আবেগ প্রকাশ করলে আত্মার শান্তি ব্যাহত হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই যাঁরা নিজেকে সংযত রাখতে পারেন না, তাঁদের এই আচার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, গরুড় পুরাণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে একটি গভীর আধ্যাত্মিক আচার হিসেবে দেখেছে। কারা যাবেন আর কারা যাবেন না—এই নির্দেশাবলি মূলত আত্মার শান্তি, উপস্থিত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতা এবং ধর্মীয় শুদ্ধতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছে।