চার বছর পেরিয়ে গেলেও জনপ্রিয় গায়ক কেকে-র প্রয়াণের স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেননি সুরকার জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব, একসঙ্গে অসংখ্য কাজের অভিজ্ঞতা এবং শেষবারের মতো দেখা হওয়ার সেই বেদনাদায়ক মুহূর্ত আজও তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।
জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের প্রথম পরিচয়। একটি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল রেকর্ডিংয়ের সূত্রেই প্রথমবার কেকে-র সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। তখনও কেকে সর্বভারতীয় খ্যাতি অর্জন করেননি। সাধারণ পোশাক, অমায়িক ব্যবহার এবং কাজের প্রতি একাগ্রতা প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই জিৎকে মুগ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে সেই পেশাগত পরিচয় ধীরে ধীরে গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়।
জিৎ বলেন, খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও কেকে কখনও নিজের স্বভাব বদলাননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং সহজ-সরল মানুষ। সঙ্গীতজগতের ব্যস্ততার মধ্যেও বন্ধুত্ব ও সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতেন। সেই কারণেই ব্যক্তিগত ও পেশাগত— দুই ক্ষেত্রেই তাঁদের যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
২০২২ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে কেকে-র সঙ্গে তাঁর শেষবার কথা হয়েছিল। একটি নতুন গানের কাজ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কেকে কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসবেন এবং অনুষ্ঠান শেষে কয়েক দিন শহরে থাকবেন বলেও জানিয়েছিলেন। সেই সময়েই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
৩১ মে রাতের ঘটনাই বদলে দেয় সবকিছু। এক বন্ধুর রেস্তরাঁয় স্ত্রীকে নিয়ে সময় কাটানোর সময় জিৎ একটি ফোন পান। ফোন করেছিলেন কেকে-র ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। ফোনের অপর প্রান্তে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি জানান, কেকে আর নেই। খবরটি শুনে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যান জিৎ।
এরপর তিনি হাসপাতালে পৌঁছে বন্ধুর নিথর দেহ দেখেন। সেই দৃশ্য আজও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। তাঁর কথায়, কেকে-কে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মঞ্চে উঠে গান গাইবেন। বাস্তবতা মেনে নেওয়া তখন তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ছিল।
কেবল শিল্পী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও কেকে ছিলেন অসাধারণ— এমনটাই মনে করেন জিৎ। তিনি একটি বিশেষ ঘটনার কথাও স্মরণ করেন। একটি ছবির গানের রেকর্ডিং চলাকালীন সময়ে জিৎ-এর বাবা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। সেই কঠিন সময়ে কেকে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বন্ধুর মানসিক অবস্থা বুঝে তাঁকে সাহস জুগিয়েছিলেন এবং রেকর্ডিংয়ের সময় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে গান গেয়েছিলেন। জিৎ-এর মুখে হাসি ফোটানো পর্যন্ত তিনি কাজ থামাতে চাইতেন না বলেও স্মরণ করেন সুরকার।
জিৎ-এর মতে, কেকে-র গায়কির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্বকীয়তা। তিনি কখনও অন্য কারও ধাঁচ অনুসরণ করেননি। নিজের স্বর, নিজস্ব আবেগ এবং অনন্য উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও কেকে-র স্মৃতি আজও অমলিন। জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, একজন শিল্পী হিসেবে কেকে-র অবদান যেমন অনন্য, তেমনি একজন বন্ধু হিসেবে তাঁর উপস্থিতিও ছিল অমূল্য। তাই বছর পেরিয়ে গেলেও বন্ধুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তিনি আজও সযত্নে হৃদয়ে আগলে রেখেছেন।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.