হার্ট অ্যাটাক মানেই আজীবন ওষুধ, অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি, পেসমেকার কিংবা শেষ পর্যন্ত হার্ট প্রতিস্থাপন—এই ধারণাটাই এত দিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি ছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হত, মানুষের হৃদ্যন্ত্র একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর নিজে থেকে সারতে পারে না। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দাবি করেছেন, মানুষের হৃদ্যন্ত্রের চারপাশে এমন কিছু বিশেষ কোষ রয়েছে, যেগুলিকে সঠিকভাবে উদ্দীপিত করা গেলে তারা নিজে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামত শুরু করতে পারে। এমনকি মৃত বা অকেজো হয়ে যাওয়া কোষের পুনরুজ্জীবনও সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘রিজেনারেশন’। এত দিন পর্যন্ত এই ক্ষমতা ইঁদুর ও কিছু সরীসৃপের মধ্যেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল। মানুষের ক্ষেত্রে তা অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া হত। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, মানুষের হৃদ্যন্ত্রের মধ্যেও সেই সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে—শুধু প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতির।
এই একই পথে গবেষণা চালাচ্ছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাও। হার্ভার্ড স্টেম সেল ইনস্টিটিউটের গবেষণায় উঠে এসেছে, হার্ট অ্যাটাকের ফলে হৃদ্যন্ত্রের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তার আশপাশে এমন কিছু কোষ থাকে যারা সীমিত পরিসরে বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ তৈরির চেষ্টা করে। এই কোষ বিভাজনের প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মাইটোসিস’। যদিও স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রক্রিয়া খুবই দুর্বল, তবে একে সক্রিয় করা গেলে হৃদ্যন্ত্র নিজেই নিজের ক্ষত সারাতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে স্টেম সেল থেরাপি। হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক থেকে স্টেম কোষ সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় যদি হার্টের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা হলে সেই স্টেম কোষ নতুন হৃদ্কোষ তৈরির কাজ শুরু করতে পারে। এর ফলে ব্লকেজের সমস্যা কমবে এবং হৃদ্যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে।
এর পাশাপাশি আরও একটি পথের কথাও উঠে এসেছে। মানুষের হৃদ্যন্ত্রেই কিছু স্টেম কোষ সুপ্ত অবস্থায় থাকে। নির্দিষ্ট জিন থেরাপি বা ওষুধের মাধ্যমে যদি এই কোষগুলিকে সক্রিয় করা যায়, তা হলে বাইরের কোনও অস্ত্রোপচার ছাড়াই হার্ট নিজের চিকিৎসা নিজেই করতে পারবে।
এই গবেষণা সফল হলে হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমবে। দাতার অভাব, জটিল অস্ত্রোপচার এবং আজীবন পেসমেকার বহনের কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খুলে যেতে পারে। একই সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
এখনও এই গবেষণা প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো হার্ট অ্যাটাক আর আজীবনের অভিশাপ হবে না—বরং হৃদ্যন্ত্রই নিজের ভাঙা অংশ জোড়া লাগিয়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।