ভারতের সামাজিক বাস্তবতায় অবিবাহিত মাতৃত্ব এখনও লজ্জা, অপরাধবোধ আর সামাজিক চাপে ঘেরা এক কঠিন অভিজ্ঞতা। মহাভারতের যুগে কুন্তীর ‘কানীন সন্তান’ কর্ণের কাহিনি সেই মানসিকতারই প্রতীক। সহস্রাব্দ পেরিয়েও সেই দৃষ্টিভঙ্গির খুব একটা বদল হয়নি। কিন্তু আধুনিক ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি যে রায় দিল, তা সেই দীর্ঘদিনের সামাজিক বদ্ধতা ভাঙার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
১৮ বছরের এক অবিবাহিত তরুণী, অবাঞ্ছিত সম্পর্কে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ৩০ সপ্তাহের গর্ভপাতের অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। বম্বে হাই কোর্ট তাঁর আবেদন খারিজ করলেও সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় বাতিল করে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—সন্তান ধারণ মানেই যে সন্তান প্রসব করতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। নারী চাইলে মা না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন, আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
শুক্রবারের এই রায়ে শীর্ষ আদালত বলে, “মহিলা না চাইলে তাঁকে আদালত সন্তানের জন্ম দিতে বাধ্য করতে পারে না।” এই বক্তব্য শুধু আইনি ব্যাখ্যা নয়, বরং নারীর শরীর ও জীবনের ওপর তাঁর নিজস্ব অধিকারের স্বীকৃতি। নারী ইতিহাস নিয়ে চর্চাকারী অধ্যাপিকা অপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রায়কে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অবাঞ্ছিত সন্তানকে অনাদরের পৃথিবীতে এনে দেওয়ার কোনও মানে নেই—তা যেমন সন্তানের জন্য ক্ষতিকর, তেমনই মায়ের জীবনও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়।
ডায়ামন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপিকা আরও বলেন, ৩০ সপ্তাহে ভ্রূণ অনেকটাই বিকশিত হলেও যদি গর্ভপাত মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে, তবে মায়ের সিদ্ধান্তই শেষ কথা হওয়া উচিত। সমাজের চাপ বা নৈতিকতার দোহাই দিয়ে একজন নারীকে আজীবনের টানাপড়েনে ঠেলে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
বিশ্বের বহু দেশে এখনও গর্ভপাতকে ‘পাপ’ বা ‘ভ্রূণহত্যা’ হিসেবে দেখা হয়। ‘প্রো-লাইফ’ আন্দোলনের প্রভাবে ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি আমেরিকার বহু রাজ্যেও গর্ভপাত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ। আমেরিকার ১৩টি রাজ্যে ছ’সপ্তাহের পর গর্ভপাত বেআইনি। সেই তুলনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমী ও প্রগতিশীল।
নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা বাসবী চক্রবর্তী মনে করেন, এই রায় নারীমুক্তি আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ করেছে। তাঁর ভাষায়, “নারী সন্তান ধারণ করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর হওয়া উচিত—এই অধিকার বহু উন্নত দেশেও স্বীকৃত নয়। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় নারীদের স্বাধীনতার যুদ্ধে পায়ের তলার মাটি শক্ত করল।”
তবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে মাতৃস্বাস্থ্যের প্রশ্নও। ভারতে ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতের জন্য অনুমতির প্রয়োজন নেই, ২০ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে মেডিক্যাল বোর্ডের অনুমতি লাগে, আর তার পরে আদালতের। এই সমস্ত নিয়ম মূলত ভ্রূণের সুরক্ষার কথা ভেবে তৈরি হলেও, মায়ের ইচ্ছা ও মানসিক অবস্থাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সেই প্রবণতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিল।
এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং সামাজিক বার্তাও—নারী অপরাধী নন, তিনি নিজের শরীর ও জীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। ভবিষ্যতে যদি তিনি আবার মা হতে চান, সেই সম্ভাবনাকেও অক্ষুণ্ণ রেখে আজ তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সম্মান করাই এক আধুনিক ও মানবিক সমাজের পরিচয়।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.