সোনা শুধু একটি ধাতু নয়, হাজার হাজার বছর ধরে এটি ক্ষমতা, ঐশ্বর্য ও নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক। উজ্জ্বল হলুদ আভা, সহজে বিবর্ণ না হওয়া বৈশিষ্ট্য, চমৎকার বিদ্যুৎ পরিবাহিতা এবং অত্যন্ত নমনীয় গঠন—এই সব গুণের জন্য সোনা আজও বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্পকলা, মুদ্রা, প্রযুক্তি ও বিশেষ করে গয়না তৈরিতে সোনার ব্যবহার অপরিহার্য। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়েও বিনিয়োগকারীদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে এই মূল্যবান ধাতু।
কেন ঘানাকে বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানাকে ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ বলা হয়। ইতিহাস অনুযায়ী, ঘানার বিপুল স্বর্ণসম্পদ এবং সমৃদ্ধ বাণিজ্যের কারণে আরব ব্যবসায়ীরা এই নাম দিয়েছিল। একসময় এই অঞ্চল থেকেই বিশ্বের বহু দেশে সোনা রপ্তানি হত, ফলে সোনা হয়ে ওঠে ঘানার অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আজও দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামোয় সোনার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও ইতিহাসে আরও কয়েকটি অঞ্চল ‘সোনার দেশ’ নামে পরিচিত ছিল। জাপানের সাদো দ্বীপ এডো যুগে ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ নামে পরিচিত ছিল, কারণ তখন দ্বীপটি জাপানের মোট সোনা উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক জোগান দিত। একইভাবে, ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন হারানো নগরী শ্রীবিজয়া তার ঐশ্বর্য ও স্বর্ণভাণ্ডারের জন্য ‘সোনার দ্বীপ’ হিসেবে খ্যাত ছিল।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোনা উৎপাদন হয় কোথায়
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা উৎপাদনকারী দেশ হলো চিন। ২০২৪ সালে চিনে আনুমানিক ৩৮০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদিত হয়েছে। জিজিন মাইনিং ও চায়না গোল্ড ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্সেসের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি এই খাতে আধিপত্য বজায় রেখেছে। ইনার মঙ্গোলিয়া ও শানসি প্রদেশে রয়েছে তাদের প্রধান খনি।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া, যেখানে ২০২৪ সালে প্রায় ৩১০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন হয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে রাশিয়ার উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও দেশটির প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন সোনার ভাণ্ডার রয়েছে। সাইবেরিয়ার অলিম্পিয়াডা খনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনার খনি হিসেবে পরিচিত।
অস্ট্রেলিয়া ২০২৪ সালে ২৯০ মেট্রিক টনের বেশি সোনা উৎপাদন করেছে। নিউমন্টের ক্যাডিয়া ভ্যালি ও বডিংটনের মতো খনি অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। দেশটির সোনার মজুতও প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন।
এর পরের স্থানে রয়েছে কানাডা, যেখানে ২০২৪ সালে ২০০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই কানাডা সোনা খননের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে প্রায় ১৭০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে নেভাডা একাই প্রায় ৭৩ শতাংশ অবদান রেখেছে। দেশটিতে বহু লোড ও প্লেসার খনি রয়েছে এবং পরিশোধন শিল্পও অত্যন্ত শক্তিশালী।
‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ হিসেবে পরিচিত ঘানা ২০২৪ সালে আনুমানিক ১৩০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করেছে। নিউমন্টের আহাফো সাউথ ও গোল্ড ফিল্ডসের টার্কওয়া খনি ঘানার উৎপাদনের মূল কেন্দ্র।
এছাড়াও ইন্দোনেশিয়া (গ্রাসবার্গ খনি), পেরু, মেক্সিকো এবং উজবেকিস্তান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সোনা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। উজবেকিস্তানে ২০২৪ সালে প্রায় ১২০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদিত হয়েছে, যার প্রধান উৎস নাভোই মাইনিংয়ের মালিকানাধীন মুরুন্তাউ খনি—বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা খনি।
উপসংহার
ইতিহাস থেকে বর্তমান—সোনার গুরুত্ব কখনও কমেনি। ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ ঘানার মতো দেশ থেকে শুরু করে চিন, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো আধুনিক শিল্পসমৃদ্ধ রাষ্ট্র—সোনা আজও বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.