দক্ষিণ কলকাতার বিজয়গড়ের একটি আবাসন হঠাৎই রবিবার সন্ধ্যার পর শোকস্তব্ধ হয়ে ওঠে। তিনতলা অনন্যা অ্যাপার্টমেন্টের উপরের ফ্ল্যাটটিই ছিল অভিনেতা Rahul Arunoday Banerjee-র বাড়ি। মায়ের সঙ্গে সেখানেই থাকতেন তিনি। কিন্তু সন্ধ্যার পর ছড়িয়ে পড়া আকস্মিক মৃত্যুসংবাদে মুহূর্তে বদলে যায় পরিবেশ। প্রথমে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি খবরটি সত্যি কিনা। ধীরে ধীরে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাড়াজুড়ে ভিড় বাড়তে থাকে, আর সবাই মেনে নিতে বাধ্য হন যে প্রিয় ‘বাবিন’ আর ফিরবেন না।
পাড়ার মানুষের কাছে অভিনেতা হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত আপনজন। স্থানীয়দের অনেকেই তাঁকে তারকা হিসেবে নয়, বরং ঘরের ছেলে বলেই ভাবতেন। তাই সন্ধ্যার পরে যখন খবরটি নিশ্চিত হতে থাকে, তখন আবাসনের সামনে জমতে শুরু করে মানুষের ভিড়। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে, কেউ আবার অতীতের স্মৃতি মনে করে চোখের জল লুকোতে ব্যস্ত।
রাত বাড়তেই টলিপাড়ার পরিচিত মুখরাও একে একে পৌঁছতে থাকেন। প্রথম দিকেই আসেন অভিনেত্রী Sudipta Chakraborty। কিছু পরে দেখা যায় Debleena Dutt এবং Soumya Mukherjee-কে। রাহুলের অভিনয় জীবনের শুরুর সময়ের সঙ্গী, একটি জনপ্রিয় ছবির সহকারী পরিচালক অমিত দাসও এসে কিছুক্ষণ ছিলেন তাঁর বাড়িতে। নীচে নেমে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করেন—কয়েক দিন আগেও রাহুল বাইক চালিয়ে দেখা করতে এসেছিলেন, পুরোনো ভয় কাটিয়ে উঠেছিলেন বলেই জানান তিনি। ঘরের মধ্যে অভিনেতার জামাকাপড় দেখে তাঁর মন ভারী হয়ে ওঠে বলেও বলেন।
এদিকে খবর পেয়ে ছুটে আসেন অভিনেত্রী Priyanka Sarkar। তিনি প্রথমে শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করেন, পরে ছেলের কাছে ফিরে যান। তবে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও বাড়িতে আসেন তিনি। তখন ঘড়িতে প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা। নীল রঙের গাড়িতে এসে পৌঁছনোর পর তাঁকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান এলাকার পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব Aroop Biswas।
এই সময় পাড়ার মানুষদের মধ্যে নানা স্মৃতি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কেউ বলছিলেন, কয়েক দিন আগেও স্থানীয় একটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন অভিনেতা। আবার কেউ মনে করছিলেন, রাত গভীর পর্যন্ত ক্রিকেট খেলার স্মৃতি। অনেকের কথাতেই উঠে আসে তাঁর সহজ-সরল স্বভাবের কথা—তারকাসুলভ দূরত্ব নাকি কখনওই তৈরি করেননি তিনি।
রাহুলের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্কও ছিল ঘনিষ্ঠ। এলাকার এক বাসিন্দা জানান, বহু বছর আগে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার বিয়ের আগের একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের স্মৃতিও তাঁদের বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই সব পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়েই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন অনেকেই।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী ও বন্ধুদের ভিড় আরও বাড়ে। মাঝরাতের দিকে পৌঁছন অভিনেত্রী Sohini Sarkar, সংগীতশিল্পী Shovan Ganguly, অভিনেতা Saurav Das এবং অভিনেত্রী Darshana Banik। একই সময়ে উপস্থিত ছিলেন গায়ক ও সঙ্গীতশিল্পী Anindya Chattopadhyay-ও।
আবাসনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি খাবারের দোকানের মালিকও স্মৃতি মনে করে বলছিলেন, রাহুল প্রায়ই তাঁর দোকানে এসে মোমো ও ভাত খেতে ভালোবাসতেন। হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটবে, তা তিনি কখনও ভাবেননি।
এদিকে শোক সামলাতে পারছিলেন না অভিনেতার মা। প্রতিবেশীদের কথায়, তাঁকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেকে আবার রাহুলের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছিলেন—এত বড় একজন তারকা হয়েও কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, সেই ভাবনাও ঘুরছিল অনেকের মনে।
রাহুলের নাট্যদলের এক সহকর্মী এসে পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেন। তাঁর কথায়, ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি রাহুলের গভীর আগ্রহ ছিল, আর সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত বাস্তব করেছিলেন তিনি। বন্ধুদের সঙ্গে বাড়িতে বসে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা—এসব স্মৃতি এখন যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
রাত ক্রমশ গভীর হলে ভিড় কিছুটা কমতে শুরু করে। অনেকেই ফিরে যান, কিন্তু শোকের আবহ কাটেনি। রাত দেড়টা নাগাদও বাড়ির ভেতরে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা ও পরিবারের সদস্যরা। বেরিয়ে আসার সময় দেবলীনা দত্ত বলেন, এই কঠিন সময়ে শক্ত থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশেষে রাত যখন প্রায় শেষের দিকে, আবাসনের সামনে ভিড় অনেকটাই কমে যায়। দূর থেকে তখনও দেখা যাচ্ছিল অভিনেতার ঘরের টিমটিম করে জ্বলতে থাকা নীল আলো—যেন এক নীরব স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন বিজয়গড়ের মানুষ অপেক্ষা করছেন পরের দিনের দুপুরের জন্য, যখন শেষবারের মতো বাড়িতে আনা হবে প্রিয় অভিনেতার মরদেহ।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.