নৈশাহার সেরে নির্দিষ্ট সময়েই শুতে গিয়েছিলেন। কিন্তু চোখে ঘুম এলেও বিছানায় গড়াগড়ি, মোবাইল স্ক্রল কিংবা “আর একটু পরে” ভাবনাতেই কেটে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শীতের রাতে লেপ টানার আলস্য, বালিশ ঠিক না করার অনিচ্ছা— সব মিলিয়ে ঘুম যেন ইচ্ছে করেই দূরে সরিয়ে রাখছেন। এই অভ্যাসের নেপথ্যে রয়েছে একটি আধুনিক মানসিক সমস্যা, যার নাম ‘রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন’।
অহমদাবাদের ঘুম বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার সোমনোলজিস্ট ডা. নীল বি প্যাটেল জানাচ্ছেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, সারাদিন কাজের চাপে নিজের জন্য সময় না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই রাতে ঘুমের সময় ‘চুরি’ করে নেওয়ার প্রবণতাই এই সমস্যা। মনে হয়, দিনের সব দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর রাতটাই একমাত্র নিজের সময়। তাই ঘুম এলেও ইচ্ছে করে দেরি করা হয়। কিন্তু এর ফল ভোগ করতে হয় শরীর ও মনে।
ঘুমের ‘জানলা’ বন্ধ হয়ে যায় কেন?
মানবদেহের একটি স্বাভাবিক জৈবঘড়ি আছে। নির্দিষ্ট সময়ে শরীর মস্তিষ্ককে ঘুমের সংকেত পাঠায়— একে বলা হয় ‘স্লিপ উইন্ডো’। সেই সময়ে বিছানায় না গেলে শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বাড়তে থাকে। কর্টিসল মস্তিষ্ককে আরও সজাগ করে তোলে, ফলে ঘুম উধাও হয়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন চললে অনিদ্রা, ক্লান্তি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং মানসিক অবসাদ পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।
ডিজিটাল কার্ফু জরুরি কেন?
ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু এখন স্মার্টফোন। শুতে যাওয়ার আগে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল, ভিডিও দেখা বা মেসেজিংয়ের ফলে মস্তিষ্ক বিশ্রামের বদলে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমোনোর অন্তত ৩০–৬০ মিনিট আগে ডিজিটাল পর্দা থেকে দূরে থাকা জরুরি। ফোন চার্জে বসিয়ে অন্য ঘরে রেখে আসা বা হাতের নাগালের বাইরে রাখলে এই অভ্যাস সহজে ভাঙা যায়।
দিন শেষ করার রুটিন তৈরি করুন
যেমন সকালে ওঠার সময় অ্যালার্ম দেওয়া হয়, তেমনই রাতে শুতে যাওয়ার সময়টাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধোয়া, নৈশাহার, পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময়, পরের দিনের কাজের তালিকা তৈরি, ডায়েরি লেখা বা হালকা বই পড়া— এই ধারাবাহিক রুটিন কয়েক সপ্তাহ মেনে চললে মস্তিষ্ক নিজেই বুঝে নেয়, দিন শেষ হচ্ছে, বিশ্রামের সময় এসেছে।
‘১০ মিনিটের নিয়ম’ কাজে লাগান
বিছানায় যেতে আলস্য বা অনিচ্ছা এলে নিজেকে মাত্র ১০ মিনিট সময় দিন। ঘুম না এলেও বিছানায় শুয়ে হালকা বই পড়ুন বা চোখ বন্ধ করে ধ্যান করুন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুম নেমে আসে।
নিজের সঙ্গে কথা বলুন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ— নিজেকে প্রশ্ন করা। কেন ঘুমোতে চাইছেন না? যদি উত্তর হয়, “নিজের জন্য সময় পাচ্ছি না”, তা হলে দিনের বেলা বা সন্ধ্যায় অন্তত ১৫–২০ মিনিট নিজের পছন্দের কাজ রাখুন। গান শোনা, হাঁটা, বই পড়া বা চুপচাপ বসে থাকা— যা আপনাকে স্বস্তি দেয়। এতে রাতের বেলা নিজের উপর ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন আসলে শরীর নয়, মনের ক্লান্তির প্রকাশ। সময়মতো ঘুমানো মানে নিজের কাছেই ফিরে আসা। একটু সচেতন হলেই এই অভ্যাস বদলানো সম্ভব— আর তার পুরস্কার, সুস্থ শরীর ও শান্ত মন।