বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিতে উৎসব মানেই আবেগ, আর সরস্বতী পুজো সেই আবেগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজোর পর শিক্ষার্থী থেকে অভিভাবক—সকলেই অপেক্ষা করে থাকেন বাগদেবীর আরাধনার দিনের জন্য। বিদ্যা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর পুজো মূলত মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়, যা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত।
সরস্বতী পুজো ২০২৬ কবে?
২০২৬ সালে সরস্বতী পুজো পড়েছে ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই দিনটি ৯ মাঘ। বছরের একেবারে শুরুতেই এই উৎসব পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ থাকে তুঙ্গে।
পঞ্চমী তিথির সময়
পঞ্চমী তিথি শুরু: ২২ জানুয়ারি রাত ১:৩৯ মিনিট
পঞ্চমী তিথি শেষ: ২৩ জানুয়ারি রাত ১২:২৯ মিনিট
এই সময়ের মধ্যেই সরস্বতী পুজো ও পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া শুভ বলে মনে করা হয়।
শিক্ষার্থীদের কাছে সরস্বতী পুজোর গুরুত্ব
সরস্বতী পুজো মানেই বই, খাতা, কলম সাজিয়ে রাখা, হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরা এবং সকাল থেকে উপোস করে অঞ্জলি দেওয়া। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করলে বিদ্যা ও বুদ্ধিতে উন্নতি ঘটে।
সরস্বতী পুজোর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র
সরস্বতী পুজোয় তিনবার অঞ্জলি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। প্রচলিত মন্ত্র—
“ওঁ জয় জয় দেবী চরাচরসারে,
কুচযুগ-শোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে,
ভগবতী ভারতী দেবী নমোহস্তুতে।”
এছাড়াও শাস্ত্রসম্মত অঞ্জলি মন্ত্র পাঠ করা হয়।
প্রণাম মন্ত্র
পুজো শেষে দেবীকে প্রণাম জানাতে বলা হয়—
“নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল-লোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে।”
সরস্বতী পুজোর গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী
শ্রীপঞ্চমীর সকালে পুজো সম্পন্ন করা হয়। সাধারণত প্রয়োজন হয়—
আমের পল্লব
ফুল
ফল
ধূপ, দীপ
বই, খাতা, কলম
সাদা বা হলুদ কাপড়
সরস্বতী পুজোর লোকাচার
লোকাচার অনুযায়ী, সরস্বতী পুজো না হওয়া পর্যন্ত কুল খাওয়া নিষেধ। স্কুল, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অঞ্জলি দেওয়ার পর কুল খাওয়ার রীতি বহুদিন ধরেই চলে আসছে।
সরস্বতী: বৈদিক দেবী থেকে আধুনিক পুজো
সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও বর্তমান প্রতিমা-পুজোর রূপটি আধুনিক কালের। একসময় পাঠশালায় তালপাতার তাড়ি, দোয়াত-কলম রেখে পুজোর প্রথা ছিল। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ধীরে ধীরে ঘরোয়া ও সর্বজনীন পুজোর প্রচলন ঘটে।
‘সরস্বতী’ শব্দের অর্থ
‘সরস’ অর্থ জল। তাই সরস্বতী শব্দের অর্থ নদী বা জনবতী। অনেক পণ্ডিতের মতে, দেবী সরস্বতী প্রথমে নদী রূপেই পূজিত হতেন, পরে তিনি জ্ঞান ও চেতনার দেবীতে রূপান্তরিত হন।
দেবী সরস্বতীর তান্ত্রিক রূপ: মাতঙ্গী
অধিকাংশ মানুষ যেখানে সরস্বতীকে সাদা শাড়ি পরিহিতা শান্ত দেবী হিসেবে জানেন, সেখানে তন্ত্র মতে তাঁর আরেক রূপ হল দেবী মাতঙ্গী। তিনি দশমহাবিদ্যার নবম রূপ এবং বিদ্যা ও সঙ্গীতের তান্ত্রিক দেবী। মাতঙ্গীকে উচ্ছিষ্টা চণ্ডালিনীও বলা হয়। শাস্ত্র মতে, জ্ঞান ও শক্তির মিলিত রূপেই তিনি পাপ নাশ করে ভক্তদের অন্তর শুদ্ধ করেন।
অসমের কামাখ্যা, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশে দেবী মাতঙ্গীর বিশেষ মন্দির রয়েছে।
উপসংহার
সরস্বতী পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রতীক। ২০২৬ সালের বসন্ত পঞ্চমীতে বাগদেবীর আরাধনার মাধ্যমে বিদ্যা ও শুভবুদ্ধির আশীর্বাদ লাভের আশায় মুখিয়ে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.