ডায়াবেটিস মানেই চিনি বর্জন—এই ধারণা বহুদিনের। তাই শুধু ডায়াবেটিকরাই নন, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষজনও আজকাল সাদা চিনির বদলে ঝুঁকছেন ‘সুগার ফ্রি’ বিকল্পের দিকে। চা-কফি থেকে শুরু করে প্রোটিন বার, মিষ্টি, ডায়েট ড্রিঙ্ক—সব জায়গাতেই জায়গা করে নিচ্ছে এরিথ্রিটলের মতো কৃত্রিম মিষ্টি উপাদান। কিন্তু এই চিনি-বিকল্প আদৌ কতটা নিরাপদ? বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই লুকিয়ে রয়েছে নতুন বিপদ।
মুম্বইয়ের ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. প্রণব ঘোড়ির মতে, এরিথ্রিটল সাদা চিনির মতো রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়ায় না—এটাই এর সবচেয়ে বড় সুবিধা। এই কারণে বহু ডায়াবেটিক রোগী নিয়মিত এটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই উপাদানটি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
এরিথ্রিটল হল এক ধরনের ‘সুগার অ্যালকোহল’—কার্বোহাইড্রেটজাত মিষ্টি উপাদান, যাতে প্রায় কোনও ক্যালোরি নেই। শরীর স্বাভাবিকভাবেই অল্প পরিমাণে এরিথ্রিটল তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে অতিরিক্ত এরিথ্রিটল শরীরে ঢুকলে তা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ডা. ঘোড়ির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নিয়মিত ও অতিরিক্ত ব্যবহারে প্লেটলেটের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। ফলস্বরূপ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের সম্ভাবনাও উঁকি দেয়।
আধুনিক গবেষণাও এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কৃত্রিম মিষ্টির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হৃদ্রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। শুধু তাই নয়, পেটের উপরও পড়তে পারে এর বিরূপ প্রভাব। দিল্লির পুষ্টিবিদ দীপালি শর্মা জানান, চিনির মতো করে যদি কেউ সব খাবারে এরিথ্রিটল ব্যবহার করেন, তা হলে গ্যাস, অম্বল, পেটফাঁপা এমনকি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা একেবারেই যে এরিথ্রিটল নিষিদ্ধ করছেন, তা নয়। বেঙ্গালুরুর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. অনুপমা এন কৃষ্ণনের মতে, সাদা চিনি, গুড় বা মধুর তুলনায় এরিথ্রিটল কিছুটা নিরাপদ বিকল্প। কিন্তু এখানেও মূল শর্ত একটাই—পরিমিত ব্যবহার। মাত্রাতিরিক্ত হলে যে কোনও ‘ভাল’ উপাদানই ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
তা হলে ডায়াবেটিকরা কী মিষ্টি খাবেন? চিকিৎসকদের মতে, স্টিভিয়া বা মঙ্ক ফ্রুটের মতো প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া মিষ্টি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবুও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হল—মিষ্টির উপর নির্ভরতা কমানো। স্বাদ বদলের অভ্যাস গড়ে তোলা, প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো এবং স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা একবাক্যে মনে করাচ্ছেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি শুধু চিনি বাদ দেওয়া নয়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এই সব কিছুর সমন্বয়েই সুস্থ থাকা সম্ভব। নচেৎ ‘সুগার ফ্রি’ তকমার আড়ালে বিপদ নিঃশব্দে বাড়তেই থাকবে।