নারী অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্ভীক কলমের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন হঠাৎই ঘোষণা করলেন—তিনি আর বই লিখবেন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় করা তাঁর এই ব্যক্তিগত ও দার্শনিক পোস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল আলোচনা, আবেগ ও বিতর্ক। বহু পাঠক ও অনুগামী এই সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ দেখছেন এটিকে জীবনের এক গভীর উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।
মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত তসলিমা নাসরিন। কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটগল্প—সব ক্ষেত্রেই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে নারী নিপীড়ন, ধর্মীয় কট্টরতা, সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলার চিন্তার প্রশ্ন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাস লজ্জা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিলেও, একই সঙ্গে ডেকে আনে তীব্র বিতর্ক। ধর্মীয় মৌলবাদীদের ফতোয়া ও মৃত্যুহুমকির মুখে তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়। নির্বাসিত জীবন, একের পর এক বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকির মধ্যেও তিনি বারবার বলেছেন—তাঁকে চুপ করানো যাবে না।
কিন্তু সেই তসলিমাই এবার জানালেন, তিনি বই লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর পোস্টে লেখিকা স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, তিনি যথেষ্ট লিখেছেন, আর লেখার প্রয়োজন বোধ করছেন না। তাঁর মতে, পৃথিবীতে ইতিমধ্যেই শত শত কালজয়ী উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধ রচিত হয়েছে। সেগুলোর চেয়ে ভালো কিছু লেখা সম্ভব নয় বলেই তাঁর অনুভব। তাই নতুন করে রচনা করার মধ্যে তিনি আর অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন না।
পোস্টে উঠে এসেছে জীবনের প্রতি তাঁর গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। সীমিত জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি লিখেছেন, বাকি দিনগুলো তিনি পড়ে, দেখে, বুঝে বা না বুঝে কাটাতে চান। নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা জলধারার শব্দ শোনা, কিংবা সমুদ্রের হাহাকার শোনার ইচ্ছার কথাও উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। এই বক্তব্যে স্পষ্ট এক ধরনের নির্লিপ্তি ও নির্ভার জীবনের আকাঙ্ক্ষা।
তসলিমা নাসরিন আরও লিখেছেন, তিনি কখনও সাফল্যের পেছনে দৌড়াননি। সাদামাটা জীবনই তাঁর পছন্দ। জীবনের পথে যত বোঝা ছিল, তা তিনি একে একে নামিয়ে রেখে এগিয়ে গেছেন। এখন আর কোনও নতুন বোঝা কাঁধে নিতে চান না। নিজেকে তিনি তুলনা করেছেন পালকের সঙ্গে—হালকা, মুক্ত ও নির্ভার। তাঁর কথায়, জীবন আসলে ধূলিকণার মতোই ক্ষণস্থায়ী।
এই ঘোষণার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে প্রতিক্রিয়ার ঢল। বহু পাঠক ও অনুগামী হতাশা প্রকাশ করেছেন। একজন অনুগামীর মন্তব্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—“একজন লেখক লেখা ছাড়া বাঁচতে পারে না, এটা সম্ভব নয়।” অনেকেই মনে করছেন, তসলিমার মতো একজন কণ্ঠস্বরের নীরব হয়ে যাওয়া মানে সমাজের জন্য এক বড় ক্ষতি।
তবে কেউ কেউ আবার মনে করছেন, এটি হয়তো লেখালেখির সম্পূর্ণ অবসান নয়, বরং এক নতুন জীবনের অধ্যায়। ইতিহাস সাক্ষী, বহু লেখকই এমন ঘোষণা দিয়েও আবার কলমে ফিরেছেন। তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে কী হবে, তা সময়ই বলবে। আপাতত তাঁর এই সিদ্ধান্ত সাহিত্যজগৎ ও পাঠকমহলে গভীর আলোড়ন তুলেছে—কলম থামলেও তাঁর লেখা ও প্রভাব যে থামবে না, তা বলাই যায়।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.