দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক এয়ার শো–র মঞ্চে ভারতীয় যুদ্ধবিমান তেজসের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল উইং কমান্ডার নমন স্যালের। চোখের সামনে এই মর্মান্তিক দৃশ্য—আকাশে বিমানের কাত হয়ে যাওয়া, পাইলটের মরিয়া চেষ্টা, এবং শেষে বিস্ফোরণে ধ্বংস—সবকিছুই মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেয় দর্শকদের। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই শোকের মুহূর্তেও থামেনি এয়ার শো। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠান চলতেই থাকে। আর সেই সিদ্ধান্তে তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করে প্রতিবাদে নিজেদের চূড়ান্ত পারফরম্যান্স বাতিল করে আমেরিকার বায়ুসেনাদল।
মার্কিন পাইলটের মানবিক অবস্থান
মার্কিন এয়ার ফোর্সের পাইলট মেজর টেলর হিয়েস্টার সামাজিক মাধ্যমে একটি আবেগঘন বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, দুর্ঘটনার এক–দু’ঘণ্টা পরে তিনি আবার অনুষ্ঠানস্থলে যান। ভাবছিলেন, পরিবেশটা নিস্তব্ধ থাকবে, দর্শকশূন্য থাকবে জায়গা। কিন্তু বাস্তব ছিল সম্পূর্ণ উল্টো—শো চলছিল যেন কিছুই ঘটেনি।
মেজর হিয়েস্টার বলেন,
“যুদ্ধবিমান প্রদর্শনী চলাকালীন ভারতীয় পাইলটের মৃত্যু হয়েছে। অথচ উদ্যোক্তারা শো চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা সেই সিদ্ধান্তে অস্বস্তি বোধ করেছি। ভারতীয় পাইলট ও তাঁর পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা শেষ প্রদর্শনী বাতিল করেছি।”
দুর্ঘটনা ঘিরে ভেসে ওঠা প্রশ্ন
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তেজস মাটি থেকে কয়েকশো মিটার উপরে স্টান্ট করতে করতে আচমকা ভারসাম্য হারায়। প্রথমবার সামলে নিতে পারলেও দ্বিতীয়বার আর পাইলটের পক্ষে বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। মিনিটের মধ্যেই তেজস তীব্র গতিতে নিচে নেমে এসে বিস্ফোরিত হয়।
শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৮ মিনিটে ঘটে এই দুর্ঘটনা। কিন্তু তার তাতেও আয়োজকদের মনোভাব বদলায়নি। সঞ্চালক স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উৎসাহ দিচ্ছিলেন দর্শকদের। শো শেষ হওয়ার পরে আয়োজক এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিদের অভিনন্দনও জানানো হয়। এ সিদ্ধান্তকেই অমানবিক বলছেন মার্কিন দলের সদস্যরা।
‘শো মাস্ট গো অন’—কিন্তু কাদের মূল্য দিয়ে?
মেজর হিয়েস্টার তীব্র আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছেন,
“সবসময় বলা হয় শো–মাস্ট–গো–অন। কিন্তু মানুষ চলে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেটার সম্মান বজায় রাখা জরুরি। আজ কেউ মারা গেলে কাল সেই একই সিস্টেম আবার বলবে, শো চলতেই হবে।”
শেষকৃত্যে অশ্রুসিক্ত পরিবার
মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দু’দিন পরে উইং কমান্ডার নমন স্যালের দেহ আনা হয় হিমাচল প্রদেশে। সামরিক মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ভারতীয় বায়ুসেনার তরফে তদন্ত শুরু হয়েছে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে।
সমালোচনার মুখে আয়োজকরা
দুবাই এয়ার শো সাধারণত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা–এভিয়েশন প্রদর্শনী। কিন্তু এ বছরের ঘটনাটি আয়োজকদের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দুঃখ ও মানবিক পরিস্থিতির প্রতি সংবেদনশীল না হয়ে শুধু সূচি রক্ষা করাতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ভারত–মার্কিন বায়ুসেনার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আরেক দৃষ্টান্ত
মার্কিন দলের প্রদর্শনী বাতিল করা কোনও নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবুও ভারতীয় পাইলটের প্রতি সম্মান দেখিয়ে যে মানবিক সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, তা দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাকে আরও গভীরতর করেছে—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।