মহাভারত সিরিয়ালে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে যিনি দর্শকের মনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, সেই অভিনেতা গজেন্দ্র চৌহান সম্প্রতি সাক্ষাৎ করলেন জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক গুরু প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে। এই সাক্ষাৎ ছিল শুধু দুই ব্যক্তিত্বের মিলন নয়, বরং ধর্ম, কর্ম এবং মানবজীবনের নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে এক গভীর ভাববিনিময়ের মুহূর্ত।
প্রেমানন্দ মহারাজ গজেন্দ্র চৌহানকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, যুধিষ্ঠিরের চরিত্র আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি ধর্মের অংশ থেকেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন—এ কারণে সেই চরিত্রে অভিনয় করা এক বিশাল দায়িত্ব। যুধিষ্ঠির কেবল একটি পৌরাণিক চরিত্র নন, তিনি ধর্মের জীবন্ত প্রতীক—এই বার্তাই স্পষ্ট করে দেন মহারাজ।
এই কথোপকথনের এক বিশেষ মুহূর্তে প্রেমানন্দ মহারাজের অনুমতি নিয়ে গজেন্দ্র চৌহান মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ আবৃত্তি করেন। সেই দৃশ্যটি ছিল পাণ্ডবদের বনবাসে যাওয়ার সময়কার, যখন দ্রৌপদী তাঁদের যাত্রা থামাতে চাইছিলেন। যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠে গজেন্দ্র বলেন—“যা কিছু ঘটতে চলেছে, তা আমাদেরই কর্মের ফল।” এই সংলাপের মাধ্যমে কর্মফল ও নিয়তির দর্শন আরও একবার সামনে আসে।
এরপর যুধিষ্ঠিরের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গজেন্দ্র চৌহান তুলে ধরেন রাম ও সোনার হরিণের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ভগবান রাম জানতেন সোনার হরিণটি আসল নয়, তবুও সীতার ইচ্ছাকে সম্মান করে তিনি তার পিছু নেন। এটি লোভের কারণে নয়, বরং কর্তব্যবোধ ও ভদ্রতার প্রতি আনুগত্য থেকেই। ঠিক তেমনই, যুধিষ্ঠিরও মনে করতেন—ভীমের গদা বা অর্জুনের তীরও যা ঘটবার, তা থামাতে পারবে না। পিতার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই তাঁদের ধর্ম, তাই বনবাস অনিবার্য।
আরেকটি সংলাপ আবৃত্তি করতে গিয়ে গজেন্দ্র চৌহান জানান, এই সংলাপটি ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা হলেই তিনি এই সংলাপ শুনতে চাইতেন—“কোনও ব্যক্তি, পরিবার, ঐতিহ্য বা প্রতিশ্রুতি জাতির ঊর্ধ্বে হতে পারে না।” এই উক্তির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও বৃহত্তর কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা উঠে আসে।
সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে গজেন্দ্র চৌহান ভীষ্ম পিতামহের প্রতিজ্ঞার উদাহরণ টানেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা ছিল কঠোর ও অটল, কিন্তু যখন ধর্ম ও শ্রীকৃষ্ণের আদেশ সামনে আসে, তখন প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করাও ধর্ম হয়ে ওঠে। এখানেই মহাভারতের সূক্ষ্ম নৈতিক দর্শন—ধর্ম স্থির নয়, পরিস্থিতি ও সত্যের সঙ্গে তার ব্যাখ্যাও বদলায়।
এই সাক্ষাৎ প্রমাণ করে দেয়, মহাভারত শুধু একটি মহাকাব্য নয়, বরং আজকের জীবনেও প্রাসঙ্গিক এক চিরন্তন দার্শনিক পাঠ—যেখানে ধর্ম, কর্ম ও মানবিক মূল্যবোধ একসূত্রে গাঁথা।