শরীরে উপস্থিত না থাকলেও আজীবন নিজের কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন জুবিন গর্গ। সময়ের ব্যবধানে কেটে গিয়েছে প্রায় তিন মাস, কিন্তু স্মৃতি আর সৃষ্টির মধ্যেই আজও জুবিন অমলিন তাঁর পরিবার, অনুরাগী ও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে। সেই স্মৃতিকে আরও সুসংগঠিত ও স্থায়ী রূপ দিতে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন প্রয়াত শিল্পীর পরিবার। শুক্রবার এক সাংবাদিক বৈঠকে গায়ক জুবিন গর্গের স্ত্রী গরিমা জানালেন, জুবিনের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হবে, যার মাধ্যমে তাঁর অপূর্ণ স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ট্রাস্ট মূলত সমাজসেবামূলক নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবে। জুবিন যে বিষয়গুলো নিয়ে জীবদ্দশায় গভীরভাবে ভাবতেন, সেগুলিই হবে ট্রাস্টের প্রধান কাজের ক্ষেত্র। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ ছিল তাঁর অন্যতম ভাবনার জায়গা। তাই বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ রক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মতো কর্মসূচি এই ট্রাস্টের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
এছাড়াও উদীয়মান প্রতিভাবান শিল্পীদের ভবিষ্যৎ কীভাবে আরও সুন্দর করা যায়, তা নিয়েও বিশেষভাবে কাজ করবে ট্রাস্ট। নতুন শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে তাঁদের প্রতিভা বিকাশে পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুবিন গর্গের সৃষ্টিসম্ভার সংরক্ষণের দায়িত্বও নেবে এই সংস্থা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর কাজ নিয়ে গবেষণা করতে পারে।
এই উদ্দেশ্যেই ট্রাস্টের পাশাপাশি একটি আলাদা গবেষণা শাখা গঠনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এই গবেষণা শাখা জুবিন গর্গের গান, সুর, শিল্পীসত্তা ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা চালাবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই ট্রাস্টের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবেন জুবিনের ফ্যান ক্লাবের সদস্যরাও, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাজ ও ভাবনার সঙ্গে একাত্ম।
প্রসঙ্গত, জীবিত অবস্থাতেই ‘কলাগুরু আর্টিস্ট ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংস্থা তৈরি করেছিলেন জুবিন গর্গ। পাশাপাশি তাঁর প্রয়াত বোনের স্মৃতিতেও একটি সংস্থা গড়েছিলেন তিনি। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার থেকে এই তিনটি সংস্থা একসঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করবে। একটাই লক্ষ্য—জুবিন গর্গের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ কাজগুলো সম্পূর্ণ করা এবং তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
অসমের ভূমিপুত্র জুবিন গর্গ জাতীয় স্তরে খ্যাতিমান এক সঙ্গীতশিল্পী। বলিউডে ‘ফিজা’, ‘গ্যাংস্টার’, ‘রাজ’, ‘থ্রিডি’, ‘কৃষ থ্রি’-এর মতো ছবিতে তাঁর কণ্ঠ দর্শকমনে গভীর ছাপ ফেলেছে। বাংলা সিনেমাতেও ‘রংবাজ’, ‘খিলাড়ি’, ‘খোকা ৪২০’-এর মতো ছবিতে গান গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। অসমিয়া ছবিতে গান গাওয়ার পাশাপাশি অভিনয়ও করেছিলেন জুবিন।
গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর মৃত্যু আজও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একথা বলাই যায়, জুবিন গর্গের মতো শিল্পীকে হারানো ভারতীয় সঙ্গীতজগতের অপূরণীয় ক্ষতি। ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা ছাপিয়ে যাওয়া এই শিল্পী তাঁর কাজের মধ্যেই আজও চিরস্মরণীয়। আর পরিবারের এই উদ্যোগ সেই স্মৃতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে রাখবে।