বলিউডে খলনায়ক চরিত্র মানেই যাঁর নাম প্রথমে মনে পড়ে, তিনি শক্তি কাপুর। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশক—টানা বহু বছর ধরে তাঁর অভিনীত নেতিবাচক চরিত্র দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে। কখনও ভয়ংকর, কখনও হাস্যরসাত্মক—তাঁর অভিনয় বলিউডের ভিলেন সংজ্ঞাকেই যেন নতুন করে লিখে দিয়েছে। তবে এই খলনায়ক ইমেজ তৈরি হওয়ার নেপথ্যে যে পারিবারিক অস্বস্তি, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং কঠিন সিদ্ধান্ত লুকিয়ে ছিল, সে কথা এতদিন অনেকটাই অজানা ছিল।
সম্প্রতি আলফানিয়ন স্টুডিওজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শক্তি কাপুর নিজের জীবনের সেই অধ্যায়ের কথা খোলাখুলি বলেন। তিনি জানান, কেরিয়ারের শুরুর দিকে যখন তাঁর দুটি বড় ছবি মুক্তি পেয়েছিল, তখন গর্বের সঙ্গে বাবা-মাকে সিনেমা হলে নিয়ে যান। সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবি ছিল ইনসানিয়াত কে দুশমন। পরিবারের আশা ছিল, ছেলেকে বড় পর্দায় দেখে আনন্দিত হবেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তবটা ছিল ঠিক উল্টো।
ছবির প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায়, শক্তি কাপুর একটি তরুণীর ওড়না ধরে টানছেন। এই দৃশ্য দেখেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁর বাবা। শক্তির কথায়, বাবা সঙ্গে সঙ্গে মাকে বলেন, “চলো, এখান থেকে বেরিয়ে যাই।” রেগে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “আগে বাইরে এসব করত, এখন বড় পর্দাতেও তাই করছে! আমি এসব দেখতে চাই না।” সেই মুহূর্তেই তাঁরা থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়ে যান।
বাড়ি ফিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। শক্তিকে কড়া ভাষায় প্রশ্ন করা হয়—কী ধরনের চরিত্রে সে অভিনয় করছে, কাদের সঙ্গে এমন দৃশ্য করছে। বাবা-মায়ের স্পষ্ট মত ছিল, হেমা মালিনী বা জিনাত আমানের মতো নামী অভিনেত্রীর সঙ্গে ভালো মানুষের চরিত্রে অভিনয় করা উচিত, গুন্ডা বা খলনায়কের ভূমিকায় নয়।
তবে বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্নের সংঘর্ষ এখানেই। বহু সংগ্রাম আর প্রত্যাখ্যানের পর শক্তি বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁর চেহারা এবং ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে যে ধরনের চরিত্র দিতে চাইছে, সেটাই তাঁর সুযোগ। সেই কারণেই তিনি বাবা-মায়ের পরামর্শ মানতে অস্বীকার করেন। স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনারাই আমাকে জন্ম দিয়েছেন, এই মুখটাই দিয়েছেন। এই চেহারা নিয়ে কেউ আমাকে নায়ক বা ভালো মানুষের চরিত্র দিচ্ছে না।”
এই খলনায়ক ইমেজের প্রভাব পড়েছিল তাঁর পরিবারেও, বিশেষ করে মেয়ে শ্রদ্ধা কাপুরের ওপর। ছোটবেলায় বাবাকে পর্দায় ভিলেন হিসেবে দেখে সে কষ্ট পেত। এক সাক্ষাৎকারে শ্রদ্ধা স্বীকার করেন, তিনি বাবাকে চিৎকার করে বলতেন, কেন তিনি খারাপ চরিত্র করছেন। পরে মা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন—এটা শুধুই অভিনয়, বাস্তব নয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তি কাপুর প্রমাণ করেন, খলনায়ক চরিত্রও শিল্প হতে পারে। আন্দাজ আপনা আপনা-র ক্রাইম মাস্টার গোগো, গুল্লার মতো চরিত্র আজও কাল্ট। কুরবানি, গুন্ডা সহ অসংখ্য ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে বলিউডের ইতিহাসে এক অনন্য জায়গা এনে দিয়েছে।
যে খলনায়ক চরিত্র একদিন বাবা-মায়ের চোখে অস্বস্তির কারণ ছিল, সেটাই শেষ পর্যন্ত শক্তি কাপুরকে অমর করে রেখেছে ভারতীয় সিনেমার পাতায়।