সরস্বতীপুজো মানেই সাদা-হলুদের আবহ, বই-খাতা, ফুল আর তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে থাকা ভোগের খিচুড়ি। দেবী সরস্বতীর ভোগে খিচুড়ি আর কুলের চাটনি যেন এক প্রাচীন রীতি। বহু বাড়িতে পুজো না থাকলেও বসন্ত পঞ্চমীর দিনে খিচুড়ি রান্না হয় অবধারিত ভাবে। কিন্তু অনেকেই ভাবেন খিচুড়ি মানেই চাল-ডাল সেদ্ধ করে ফোড়ন দিলেই হল। আসলে বিষয়টা মোটেও তত সহজ নয়। খিচুড়ির স্বাদ নির্ভর করে ছোট ছোট কিছু কৌশল আর ভুল এড়ানোর উপর।
চাল বাছাইই প্রথম শর্ত
সরস্বতীপুজোর খিচুড়িতে সাধারণত গোবিন্দভোগ চাল ব্যবহার করা হয়। এই চালের নিজস্ব গন্ধ ও মিষ্টি স্বাদ খিচুড়িকে আলাদা মাত্রা দেয়। দেরাদুন বা আতপ চালেও খিচুড়ি করা যায়, তবে ভোগের জন্য গোবিন্দভোগই আদর্শ।
জলের পরিমাণে ভুল হলেই সর্বনাশ
খিচুড়ি রান্নার সময় সবচেয়ে বড় ভুল হল অতিরিক্ত জল দেওয়া। শুরুতেই বেশি জল দিলে চাল-ডাল সেদ্ধ হতে সময় বেশি লাগে এবং খিচুড়ি অত্যন্ত পাতলা হয়ে যায়। পরিমাণ মতো জল দিয়ে ধীরে ধীরে সেদ্ধ করাই শ্রেয়।
চাল-ডাল ভিজিয়ে রাখা জরুরি, তবে বেশি নয়
চাল-ডাল ধুয়ে প্রায় ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে রান্না সহজ হয়। তবে দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে চাল দ্রুত গলে গিয়ে খিচুড়ির টেক্সচার নষ্ট হতে পারে।
হলুদ দেওয়ার সঠিক সময়
চাল-ডাল ফুটতে শুরু করলে উপরে যে ফেনা ওঠে, তা ফেলে দেওয়া ভালো। এই ফেনা ওঠার আগেই যদি হলুদ দেওয়া হয়, তাহলে ফেনার সঙ্গে হলুদও বেরিয়ে যায় এবং খিচুড়ির রং ফিকে হয়ে পড়ে। তাই চাল-ডাল সেদ্ধ হয়ে এলে তবেই হলুদ ও নুন যোগ করা উচিত।
সব্জির ভূমিকা অপরিসীম
শীতকালের সরস্বতীপুজোয় খিচুড়িতে সাধারণত ফুলকপি, কড়াইশুঁটি, গাজর বা কুমড়ো ব্যবহার করা হয়। সব্জিগুলি কেটে ধুয়ে তেলে হালকা সাঁতলে নেওয়া জরুরি। কাঁচা সব্জি সরাসরি দিলে স্বাদ তেমন আসে না। ফুলকপি বড় ডুমো করে কাটলে খিচুড়ির মধ্যে সুন্দর ভাবে আলাদা থাকে।
মশলার ভারসাম্যই স্বাদের চাবিকাঠি
তেল গরম করে তেজপাতা ও জিরে ফোড়ন দিতে হবে। গন্ধ বেরোলে আদা-কাঁচালঙ্কা ও টম্যাটো বাটা যোগ করে মশলা কষাতে হবে। তেল ছাড়লে সেই মশলা সেদ্ধ চাল-ডালের সঙ্গে মিশিয়ে ভালো করে নাড়তে হবে।
ঘিয়ের ফোড়নেই পূর্ণতা
গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়িতে ঘিয়ের ফোড়ন অপরিহার্য। ২ টেবিল চামচ ঘিয়েতে শুকনো লঙ্কা ও কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিলে খিচুড়ির গন্ধ ও স্বাদ দু’টোই বেড়ে যায়। রান্নার শেষ ৫–৭ মিনিট আগে কড়াইশুঁটি এবং চাইলে অল্প চিনি যোগ করা যায়। একেবারে শেষে ফোড়ন দেওয়া সবচেয়ে ভালো।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, খিচুড়ি গরম অবস্থায় সামান্য পাতলা রাখাই আদর্শ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জল শুকিয়ে খিচুড়ি এমনিতেই ঘন হয়ে যাবে। শুরুতেই বেশি ঘন হলে পরে বসে গিয়ে খাওয়ার স্বাদ কমে যায়। প্রতিটি ধাপ ঠিকঠাক মানলে সরস্বতীপুজোর ভোগের খিচুড়ি হবে একেবারে মায়ের প্রসাদের মতো—স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়।