বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র দূষিত কণা ও বিষাক্ত গ্যাস আজ নীরব ঘাতকের মতো কাজ করছে। এতদিন বায়ুদূষণকে মূলত শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা—হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। বায়ুদূষণ সরাসরি হৃদ্যন্ত্রের উপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু যানবাহনের ধোঁয়াই নয়, নির্মাণস্থলের ধুলো, আবর্জনার স্তূপ, সেই আবর্জনায় আগুন ধরানো, নিকাশি নালার দূষিত গ্যাস—সব মিলিয়েই প্রতিনিয়ত বাতাস দূষিত হচ্ছে। এই দূষিত কণা শরীরে প্রবেশ করে নাক, গলা, ফুসফুস এমনকি ত্বকের মাধ্যমেও রক্তে মিশে যেতে পারে।
কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হৃদ্যন্ত্র?
গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়লে শরীরে ‘গ্যালেক্টিন’ নামের একটি প্রোটিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই প্রোটিনের আধিক্য হৃদ্পেশির ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এর ফলে ধমনীর মধ্যে ব্লকেজ তৈরি হতে পারে এবং ‘মায়োকার্ডিয়াল ফাইব্রোসিস’ নামে পরিচিত এক জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এই প্রক্রিয়ায় ফাইব্রোব্লাস্ট নামের কোষ অতিরিক্ত কোলাজেন তৈরি করতে শুরু করে, যা হৃদ্পেশিতে ক্ষত সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে তা হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বায়ুদূষণের কুপ্রভাব সবার উপরই পড়ে, তবে কিছু মানুষ বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন—
অন্তঃসত্ত্বা মহিলা
শিশু
বয়স্ক ব্যক্তি
ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগী
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা যদি দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় থাকেন, তার প্রভাব গর্ভস্থ সন্তানের উপরেও পড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতে শিশুর শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্সংক্রান্ত সমস্যার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
বায়ুদূষণ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও কিছু নিয়ম মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
১. মাস্ক ব্যবহার করুন:
বাইরে বের হলে ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার করা উচিত, বিশেষত যেখানে ধুলো ও ধোঁয়া বেশি।
২. দূষিত এলাকা এড়িয়ে চলুন:
অতিরিক্ত ধোঁয়া-ধুলোযুক্ত এলাকা এড়িয়ে চলা উচিত।
৩. ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখুন:
বাড়িতে শিশু বা বয়স্ক থাকলে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘর নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
৪. ব্যায়ামের সময় সতর্কতা:
খুব ভোরে বা সন্ধ্যার পর দূষণের মাত্রা বেশি থাকে। রাস্তার ধারে দৌড়ানোর বদলে পার্ক বা ঘরের ভিতরে ব্যায়াম করা ভালো।
৫. পুষ্টিকর খাবার খান:
ভিটামিন সি ও ই এবং ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। যেমন—আমলকি, পেয়ারা, বিভিন্ন বাদাম ও বীজ, সামুদ্রিক মাছ।
৬. ধূমপান বর্জন করুন:
ধূমপান হৃদ্যন্ত্রের উপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করে। তাই ধূমপান কমানো বা সম্পূর্ণ বন্ধ করাই শ্রেয়।
৭. ঘরের ধোঁয়া এড়ান:
ধূপকাঠি, কয়েল ইত্যাদির ধোঁয়া বয়স্কদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৮. পর্যাপ্ত জল পান করুন:
জল শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে এবং রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে।
৯. শ্বাসের ব্যায়াম করুন:
প্রাণায়ামের মাধ্যমে ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রকে শক্তিশালী রাখা যায়। ডান নাসিকা চেপে বাঁ দিক দিয়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার পর, বাঁ নাসিকা চেপে ডান দিক দিয়ে একই প্রক্রিয়া করলে শ্বাসপ্রশ্বাসের সুষম ব্যায়াম সম্পন্ন হয়।
বায়ুদূষণ আজ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বড় সংকট। ফুসফুসের পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্রকেও রক্ষা করতে এখন থেকেই সচেতনতা ও সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে বাড়তি যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সচেতন জীবনযাপনই পারে দূষণের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে।