শিক্ষা মানেই কি শুধু নম্বর, পরীক্ষা এবং প্রতিযোগিতা? বিশ্বের বহু দেশে এখনও এই ধারণাই প্রচলিত। তবে ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটে তৈরি করেছে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা এবং সার্বিক বিকাশকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই কারণেই ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ফিনল্যান্ডের স্কুলব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, সেখানে শিশুদের ওপর অল্প বয়স থেকেই পরীক্ষার চাপ তৈরি করা হয় না। ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত কোনও বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় না পড়ুয়াদের। ছোটবেলা থেকেই নম্বরের দৌড়ে নামিয়ে দেওয়ার বদলে, খেলাধুলা, দলগত কাজ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
শুধু পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, স্কুল খোলার দিনের সংখ্যার দিক থেকেও ফিনল্যান্ড বিশ্বের অনেক দেশের থেকে আলাদা। সেখানে বছরে মাত্র ১৮০ দিন স্কুল খোলা থাকে। অর্থাৎ, প্রায় ১৮৫ দিন ছুটি পায় ছাত্রছাত্রীরা। তুলনায় ভারতে বছরে প্রায় ২৪০ দিন স্কুল খোলা থাকে। ফলে ফিনল্যান্ডের পড়ুয়ারা পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্রাম, খেলাধুলা এবং নিজেদের পছন্দের কাজের জন্যও যথেষ্ট সময় পায়।
হোমওয়ার্কের ক্ষেত্রেও ফিনল্যান্ডের নীতি অত্যন্ত নমনীয়। সেখানে পড়ুয়াদের খুব কম হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় এবং স্কুলের পর অতিরিক্ত টিউশনের প্রয়োজনও তেমন পড়ে না। অন্যদিকে, ভারতে বহু ছাত্রছাত্রীকে নিয়মিত স্কুলের পাশাপাশি অতিরিক্ত টিউশনের বোঝা বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের পর প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত টিউশনে কাটাতে হয়, যার ফলে তাদের অবসর এবং খেলাধুলার সময় কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং পরীক্ষার চাপ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের অভাব, উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটের মতো সমস্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব এবং সৃজনশীল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল শিক্ষকরা। সেখানে শিক্ষকতা অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য মাস্টার্স ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি, শ্রেণিকক্ষে কীভাবে পড়ানো হবে, সেই বিষয়ে শিক্ষকদের যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তাঁরা শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর ব্যক্তিগত চাহিদা এবং শেখার ধরন অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তথ্য অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডের একজন শিক্ষক বছরে গড়ে প্রায় ৬০০ ঘণ্টা পড়ান। অন্যদিকে, ভারতে শিক্ষকদের কাজের সময় প্রায় ১,৭০০ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই পার্থক্য শিক্ষার গুণগত মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল থেকে ভারতের অনেক কিছু শেখার রয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে যদি ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা এবং সার্বিক বিকাশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার মূল স্রোতে আনা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি করাও সময়ের দাবি।
তবে প্রতিটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। তাই কোনও দেশের শিক্ষা মডেল হুবহু অনুসরণ করার বদলে, তার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.