পৌষ সংক্রান্তি ও মকর সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আবারও বসতে চলেছে বাংলার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ—গঙ্গাসাগর মেলা। প্রতি বছর এই সময়ে বাংলার পাশাপাশি ভিন্রাজ্য থেকেও লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ভিড় জমান সাগরদ্বীপে। কপিলমুনির আশ্রম প্রাঙ্গণকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এই পুণ্যস্নান ও সাধুসন্তদের মহামিলনক্ষেত্র।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ১০ জানুয়ারি থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে গঙ্গাসাগর মেলা। মেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ পুণ্যস্নান। শাস্ত্র মতে, পুণ্যস্নানের শ্রেষ্ঠ সময় পড়ছে ১৪ জানুয়ারি সকাল ৬টা ৫৮ মিনিট থেকে ১৫ জানুয়ারি সকাল ৬টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত। মকর সংক্রান্তি শুরু হবে ১৪ জানুয়ারি দুপুর ২টা ৫৮ মিনিটে।
মেলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে সোমবার সাগরদ্বীপে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মেলা-পরিকাঠামো পরিদর্শনের পাশাপাশি মুড়িগঙ্গার উপর চার লেনের সেতুর শিলান্যাস করেন। পরে মুখ্যমন্ত্রী কপিলমুনির আশ্রমেও যান এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
পুণ্যার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে পূর্ব রেল বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেল সূত্রে খবর, ৯ জানুয়ারি থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শিয়ালদা ডিভিশনের দক্ষিণ শাখায় মোট ১২৬টি অতিরিক্ত EMU লোকাল ট্রেন চলবে। প্রয়োজনে আরও স্পেশাল ট্রেন চালানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এই বছর প্রথমবারের মতো প্রতিদিন ২৩ জোড়া EMU ট্রেন চালানো হবে। এর মধ্যে শিয়ালদহ–নামখানা এবং শিয়ালদহ–কাকদ্বীপ রুটে ১০ জোড়া করে বিশেষ গঙ্গাসাগর স্পেশাল ট্রেন থাকবে। শিয়ালদা স্টেশনের ১৫ ও ১৬ নম্বর প্ল্যাটফর্ম এবং কাকদ্বীপ স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম শুধুমাত্র গঙ্গাসাগর মেলার যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
প্রতিটি ট্রেনে গড়ে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ পুণ্যার্থী যাতায়াত করতে পারবেন। ভিড় সামাল দিতে ‘ফার্স্ট কাম, ফার্স্ট সার্ভড’ নীতি ও ওয়ান-ওয়ে ফ্লো সিস্টেম চালু করা হয়েছে। শিয়ালদা ও কাকদ্বীপ—দুই স্টেশনেই বিশেষ ম্যানেজার নিয়োগ করে গোটা ব্যবস্থার উপর কড়া নজর রাখবে রেল প্রশাসন।
রেল সূচি অনুযায়ী, নামখানা ও কাকদ্বীপ থেকে শিয়ালদা ও কলকাতা স্টেশনের দিকে মোট ৫৬টি এবং উল্টোদিকে ৭০টি স্পেশাল ট্রেন চলবে। শিয়ালদা থেকে নামখানার দিকে ট্রেন ছাড়বে রাত ১২:০১, ০১:২৩, ০২:৫৫, ভোর ০৬:১৫ ও দুপুর ০২:৪০-এ। কলকাতা স্টেশন থেকে নামখানার দিকে স্পেশাল ট্রেন থাকবে সকাল ০৭:৩৫, ০৮:২৪ এবং রাত ০৯:৩০-এ। নামখানা থেকে শিয়ালদার দিকে ট্রেন চলবে রাত ১২:০৭, ০১:০৬, ০১:২৫, ০২:৫২, সকাল ০৯:১০, ১১:১৮, সন্ধ্যা ০৬:৩৫ ও রাত ১০:১০-এ। কাকদ্বীপ থেকে শিয়ালদার দিকে একটি স্পেশাল ট্রেন ছাড়বে দুপুর ২:১৬ মিনিটে। এছাড়াও দিনভর আরও একাধিক ট্রেন চলবে এই রুটে। রানাঘাট–গেদে সেকশনের যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত ৩ জোড়া নতুন ট্রেন চালানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
রেলপথের পাশাপাশি সড়ক ও জলপথেও থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা। প্রায় ২,৫০০টি বাস, ৩২টি ভেসেল, ১০০টি লঞ্চ এবং ২১টি জেটির মাধ্যমে পুণ্যার্থীদের পরিবহণ করা হবে। নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে মোতায়েন থাকবেন প্রায় ১২ হাজার পুলিশ কর্মী। পাশাপাশি থাকবে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, GPS ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরদারি ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে, পুণ্যার্থীদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাত্রা এবং নির্বিঘ্ন পুণ্যস্নানের জন্য প্রশাসন ও রেলের তরফে নেওয়া হয়েছে কড়া ও বিস্তৃত প্রস্তুতি।