দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মাকুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে ফের একবার ভোট গণনার প্রস্তুতি নিয়ে বিতর্ক। এনিউমারেশন সংক্রান্ত কার্যকলাপ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মহলে দাবি উঠছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে থানা মাকুয়া পঞ্চায়েত এলাকার পোদরা কলোনির ১০৪ নম্বর বুথকে ঘিরে। অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক লেভেল অফিসার (বিএলও) বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম বিলি না করে স্থানীয় একটি মন্দিরে বসে এনিউমারেশন ফর্ম বিতরণ করছিলেন। সেই ছবিই ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক মাধ্যমে, আর তার পর থেকেই জোরালো রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে দুই শিবিরে।
বিজেপির গুরুতর অভিযোগ, ভোটারদের সঙ্গে বঞ্চনার চেষ্টা
স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এনিউমারেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিয়ম একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ফর্ম পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব থাকলেও বিএলও সেই কর্তব্য পালন করেননি। বরং স্থানীয় একটি মন্দিরে বসে ফর্ম বিলি করা হয়েছে, যা কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী সরাসরি লঙ্ঘন।
বিজেপি কর্মী বাপি সাউ বলেন,
“গ্রামবাসীরা অভিযোগ করে বলেছেন, বাড়ি বাড়ি ফর্ম দেওয়া হচ্ছে না। অথচ মন্দিরে বসে ফর্ম দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই অফিস টাইমে বাড়িতে থাকেন না। ফলে তাঁরা এই পরিষেবা পাচ্ছেন না। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে।”
রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই এলাকায় এমন অভিযোগ সামনে আসতেই বিজেপি কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। সেখানে তাঁদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য মঞ্জু সেন। এই সংঘাতের ভিডিও–ছবিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
তৃণমূলের পাল্টা দাবি: ‘বিরোধীদের চক্রান্ত’
অভিযোগের তীব্রতা সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
পঞ্চায়েত সদস্য মঞ্জু সেন বলেন,
“বিরোধী দল চক্রান্ত করছে। ওঁকে (বিএলও) বসার জায়গা দিতে হয়েছিল। এখানে বসে তিনি শুধু ফর্ম সর্টিং করছিলেন। তখন হয়তো দু’একজন এসে ফর্ম নিয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি নিয়মমাফিক বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। বিজেপি মিথ্যা অভিযোগ তুলছে।”
মঞ্জু সেন আরও দাবি করেন, ১০৪ নম্বর বুথে প্রায় ১২০০ ভোটার রয়েছেন। একজন বিএলও-র পক্ষে বাড়ি বাড়ি সব ভোটারকে চেনা বা প্রতিটি পরিবারের অবস্থান জানা সম্ভব নয়। তাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মাত্র। কিন্তু বিরোধীরা বিষয়টিকে অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
বিএলও–র সাফাই, ‘মন্দিরে ফর্ম বিলি নয়, কেবল সর্টিং’
অভিযুক্ত BLO সোমা জানা বেরা গোটা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—
“মন্দিরে বসে ফর্ম বিলি করা হয়নি। বাড়ি বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে ফর্মগুলো আলাদা করে সাজানো হচ্ছিল। সেই সময় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কী দেখেছেন বা কী মনে করেছেন, তা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারি না। তবে আমি যথাযথভাবেই কাজ করছি।”
সোমা জানান, ফর্ম সর্টিংয়ের সময় কেউ যদি এসে ফর্ম নিয়ে যান, তার দায় তিনি নিতে পারেন না। কিন্তু নিয়ম বহির্ভূতভাবে ফর্ম বিলি করা হয়নি।
রাজনৈতিক উত্তাপ চড়েছে এলাকাজুড়ে
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। বিজেপির দাবি, ফর্ম বিলির এই ‘অনিয়মের মাধ্যমে’ ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব ও কারচুপির সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছেন প্রশাসনিক কর্মীরা।
দ্বিতীয়দিকে, তৃণমূল নেতৃত্ব বলছে, বিরোধীরা প্রশাসনিক কাজে বাধা সৃষ্টি করে অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে। তাঁরা মনে করছেন, একমাত্র রাজনৈতিক লাভের আশায় এমন অভিযোগ আনা হচ্ছে, যার ভিত্তি নেই।
বুথ এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর থেকেই ১০৪ নম্বর বুথের পোদরা কলোনিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, বাড়ি বাড়ি ফর্ম না পৌঁছনো হলে বহু মানুষই গুরুত্বপূর্ণ গণনাপ্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
অন্যদিকে অনেকেই বলছেন, অভিযোগ অতিরঞ্জিত। বাস্তবে বিএলও-র কাজ সহজ নয়, তাই কোথাও বসে ফর্ম আলাদা করা বা নাম যাচাই করায় দোষ নেই।
তবে সবারই প্রত্যাশা— নির্বাচন কমিশন যেন বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে দেখে।
নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা
বিজেপি নেতৃত্ব জানিয়েছে, তাঁরা এই ঘটনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাদের দাবি,
ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে
সংশ্লিষ্ট বিএলও-র ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে
ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে
তৃণমূল অবশ্য বলছে, কমিশনে অভিযোগ জানানো বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশল।
গ্রাম পঞ্চায়েতে রাজনৈতিক সমীকরণের প্রভাব
মাকুয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এবং দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে শাসক তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত তীব্র। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা দুই পক্ষের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
স্থানীয়রা মনে করছেন,
গ্রামে বিরোধী-বহুল অঞ্চল হওয়ায় ছোটখাটো প্রশাসনিক ঘটনাও দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিচ্ছে
দলীয় কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে তুচ্ছ বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে
এনিউমারেশন প্রক্রিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এনিউমারেশন বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
নতুন ভোটার যুক্ত করা
মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া
ঠিকানা বা বয়সের সংশোধন
পরিবারের সদস্যসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ
এসবই নির্ভর করে সঠিক এনিউমারেশনের উপর।
তাই ফর্ম বিতরণের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠলে তা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ, ভুল তথ্য বা ভুল ফর্ম পুরনো বা নতুন ভোট সংখ্যা প্রভাবিত করতে পারে।
গ্রামবাসীর দাবি
‘স্বচ্ছতা থাকুক, রাজনীতি নয়’
এলাকার বহু বাসিন্দা জানিয়েছেন, তাঁরা চান প্রশাসনিক কাজ সঠিক নিয়মে হোক। রাজনীতি যেন এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে। অনেকেই বলছেন,
“বিএলও যদি মন্দিরে বসে থাকেন, সেটার কারণ দেখা উচিত। কিন্তু বিজেপি–তৃণমূলের ঝামেলায় সাধারণ মানুষের কাজ যেন বাঁধা না পায়।”
এখন নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে
বিজেপির অভিযোগ এবং তৃণমূল–বিএলও–র বক্তব্য সব মিলিয়ে এখন নজর কমিশনের দিকে। তাঁদের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। তবে
অভিযোগের গুরুত্ব
ভাইরাল হওয়া ছবি
রাজনৈতিক উত্তেজনা
সবকিছু মিলিয়ে কমিশন যে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখতে পারে, তা অনুমেয়।
আরও পড়ুন
BLO বাড়িতে এসে দিয়েছে SIR ফর্ম? জমা না দিলে কী হবে? ফর্ম পূরণের সঠিক নিয়ম
উপসংহার
মন্দিরে বসে এনিউমারেশন ফর্ম বিলির অভিযোগ ঘিরে দক্ষিণ হাওড়ার মাকুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। বিজেপি সরাসরি প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে, তৃণমূল পাল্টা দাবি করছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের। বিএলও নিজেও অভিযোগ খারিজ করেছেন। এখন কমিশনের তদন্ত ও সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র অঞ্চল।
FAQ
1. প্রশ্ন: কোথায় এই ঘটনাটি ঘটেছে?
উত্তর: দক্ষিণ হাওড়ার মাকুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের পোদরা কলোনির ১০৪ নম্বর বুথে।
2. প্রশ্ন: অভিযোগটি কার বিরুদ্ধে?
উত্তর: ব্লক লেভেল অফিসার (বিএলও) সোমা জানা বেরার বিরুদ্ধে।
3. প্রশ্ন: মূল অভিযোগ কী?
উত্তর: বাড়ি বাড়ি না গিয়ে মন্দিরে বসে এনিউমারেশন ফর্ম বিলি করা।
4. প্রশ্ন: অভিযোগ কে করেছে?
উত্তর: স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব এবং কর্মীরা।
5. প্রশ্ন: ভাইরাল হওয়া ছবি কোথায় তোলা হয়েছিল?
উত্তর: স্থানীয় একটি মন্দিরের ভিতরে।
6. প্রশ্ন: বিজেপির দাবি কী?
উত্তর: সাধারণ মানুষের বাড়িতে ফর্ম পৌঁছায়নি—মন্দিরে বসে দেওয়া হয়েছে।
7. প্রশ্ন: তৃণমূলের অবস্থান কী?
উত্তর: তাঁরা বলছেন বিরোধীরা চক্রান্ত করছে, ফর্ম বিলি করা হয়নি—শুধু সর্টিং।
8. প্রশ্ন: পঞ্চায়েত সদস্য মঞ্জু সেন কী বলেছেন?
উত্তর: তিনি দাবি করেছেন, বিএলও-কে শুধু বসার জায়গা দেওয়া হয়েছিল।
9. প্রশ্ন: পঞ্চায়েত সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয় কী?
উত্তর: তৃণমূল কংগ্রেস।
10. প্রশ্ন: ওই বুথে মোট কতজন ভোটার রয়েছে?
উত্তর: প্রায় ১২০০ জন ভোটার।
11. প্রশ্ন: বিএলও কী যুক্তি দিয়েছেন?
উত্তর: তিনি বলেছেন, সেখানে শুধু ফর্ম সর্টিং করছিলেন, বিলি করেননি।
12. প্রশ্ন: মন্দিরে থাকাকালীন কি কেউ ফর্ম নিয়েছে?
উত্তর: বিএলও বলেছেন, হয়তো কেউ দেখে বা জিজ্ঞেস করে নিয়েছেন।
13. প্রশ্ন: বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ কোথায় জানানো হয়েছে?
উত্তর: নির্বাচন কমিশনের কাছে।
14. প্রশ্ন: স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন?
উত্তর: কেউ মনে করছেন অনিয়ম হয়েছে, কেউ বলছেন অভিযোগ অতিরঞ্জিত।
15. প্রশ্ন: কেন এনিউমারেশন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন নাম যোগ, আপডেট—সবই এতে নির্ভর করে।
16. প্রশ্ন: ঘটনাকে কেন্দ্র করে কী হয়েছে?
উত্তর: এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
17. প্রশ্ন: বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে কী ধরনের বচসা হয়েছে?
উত্তর: অভিযোগ করার সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
18. প্রশ্ন: ভাইরাল হওয়া ছবির প্রভাব কী?
উত্তর: অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে এবং গ্রামবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
19. প্রশ্ন: বিরোধীরা কেন এই অভিযোগ তুলছে বলে তৃণমূলের দাবি?
উত্তর: তৃণমূল বলছে বিরোধীরা চক্রান্ত করে প্রশাসনিক কাজে বাধা দিচ্ছে।
20. প্রশ্ন: এনিউমারেশন ফর্ম কী ধরনের ফর্ম?
উত্তর: ভোটার তালিকা সংশোধন বা আপডেটের জন্য প্রয়োজনীয় ফর্ম।
21. প্রশ্ন: বিএলও-র দায়িত্ব কী?
উত্তর: বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ফর্ম সরবরাহ ও সংগ্রহ করা।
22. প্রশ্ন: অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী শাস্তি হতে পারে?
উত্তর: নির্বাচন কমিশন চাইলে তিরস্কার, বদলি বা দায়িত্ব পরিবর্তন করতে পারে।
23. প্রশ্ন: স্থানীয় বিজেপি কর্মীর নাম কী?
উত্তর: বাপি সাউ।
24. প্রশ্ন: বিরোধী দল কোন বিষয়টিকে অনিয়ম বলছে?
উত্তর: বাড়িতে না গিয়ে মন্দিরে বসে সাধারণ ভোটারদের ফর্ম দেওয়া।
25. প্রশ্ন: এখন জনগণের প্রত্যাশা কী?
উত্তর: নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছভাবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া।
#ElectionUpdate #BLOControversy #WestBengalPolitics

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.