ডাল বাঙালির প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ ডাল খেলেই অনেকের পেট ফেঁপে যায়, গ্যাস, অম্বল কিংবা বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যার জন্য বহুদিন ধরেই কাঠগড়ায় তোলা হয় ডাল রান্নার সময় ওপরে ওঠা সাদা ফেনাকে। অনেকের ধারণা, এই ফেনা বিষাক্ত এবং পেটের গোলমালের মূল কারণ। কিন্তু এই ধারণা কি আদৌ বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক?
রায়পুরের ক্যানসার চিকিৎসক জয়েশ শর্মা সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় এই বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ডালের ফেনা মোটেই বিষাক্ত নয় বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। এই ফেনার মধ্যে থাকে প্রোটিন, সামান্য স্টার্চ এবং একটি প্রাকৃতিক যৌগ—স্যাপোনিন।
স্যাপোনিন এমন একটি যৌগ, যা বিভিন্ন উদ্ভিদে যেমন সয়াবিন, শিম, চা পাতা এবং কিছু সামুদ্রিক প্রাণীতেও পাওয়া যায়। জলে মেশালে এটি সাবানের মতো ফেনা তৈরি করে বলেই ডাল রান্নার সময় ওপরে সাদা আস্তরণ দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, এই স্যাপোনিনের একাধিক স্বাস্থ্যগুণও রয়েছে। এটি কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, প্রদাহ হ্রাস করে এবং ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিতে পারে। এমনকি ওষুধ ও প্রসাধনী শিল্পেও এই যৌগের ব্যবহার রয়েছে।
তবে চিকিৎসক এটাও জানিয়েছেন, অতিরিক্ত মাত্রায় স্যাপোনিন গ্রহণ করলে ডালের স্বাদ তেতো লাগতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্রের আস্তরণে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ইরিটেবল বাওল সিনড্রোম (IBS)-এ ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ফেনা পেটে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে পেটফাঁপা বা গ্যাসের জন্য ডালের ফেনা দায়ী নয়। চিকিৎসকের ভাষায়, ডালের মধ্যে থাকা কিছু জটিল শর্করা আসল সমস্যা তৈরি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এগুলিকে বলা হয় FODMAP। এই ধরনের শর্করা সহজে হজম হয় না এবং অন্ত্রে গিয়ে গ্যাস তৈরি করে, যার ফলে পেট ফেঁপে যায় ও অস্বস্তি হয়।
তাহলে ডাল খেলে কীভাবে এই সমস্যা কমানো যায়?
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ডাল রান্নার আগে ভাল করে জলে ভিজিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ভেজানোর জল ফেলে দিলে এই জটিল শর্করার পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। পাশাপাশি ডাল রান্নার জন্য প্রেশার কুকার ব্যবহার করা সবচেয়ে ভাল। কারণ প্রেশার কুকারে উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না হলে FODMAP ভেঙে যায় এবং স্যাপোনিনের প্রভাবও কমে আসে। ফলে ডাল সহজে হজম হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পেটফাঁপা এড়াতে ডালের ফেনা ফেলে দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক পদ্ধতিতে ডাল ভিজিয়ে ও প্রেশার কুকারে রান্না করলেই ডাল হবে সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং সহজপাচ্য।