পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাস নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়াল। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে দুই নার্স নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা চলছে। নমুনা পরীক্ষার জন্য পুণেতে পাঠানো হয়েছে। সরকারি ভাবে নিশ্চিত রিপোর্ট আসার অপেক্ষায় থাকলেও স্বাস্থ্য মহলে ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি হয়েছে।
নিপা ভাইরাস কী এবং কী ভাবে ছড়ায়
নিপা একটি মারাত্মক ‘জুনোটিক ভাইরাস’, অর্থাৎ পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। এই ভাইরাসের প্রধান উৎস বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল সুস্থ ফলের সঙ্গে মিশে গেলে সেখান থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক, থুতু-লালা, মূত্র বা অন্যান্য জিনিসের মাধ্যমেও নিপা ছড়াতে পারে। শুয়োর থেকেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
এই ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল এর মৃত্যুহার—প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। এখনও পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট টিকা বা নিশ্চিত ওষুধ নেই। রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই অনেক সময় বাঁচার একমাত্র ভরসা।
লক্ষণ: সাধারণ জ্বর ভেবে ভুল করলে বিপদ
নিপা ভাইরাসে সংস্পর্শে আসার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি বমি ভাবের মতো সাধারণ ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে।
যদি রোগী হঠাৎ আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, ভুল বকা শুরু করেন, কাউকে চিনতে না পারেন, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত উন্নত পরিষেবা আছে এমন হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ব্রেনে প্রদাহ বা এনসেফেলাইটিস হয়, যা রোগীকে কোমায় নিয়ে যেতে পারে। ৫–৬ দিনের মধ্যেই অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুসে সংক্রমণ হলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট রয়েছে এমন রোগীর মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি।
রোগ নির্ণয় কেন কঠিন
সাধারণ রক্তপরীক্ষায় নিপা ভাইরাস ধরা পড়ে না। বায়ো-সেফটি লেভেল-থ্রি মানের বিশেষ ল্যাবরেটরিতেই এই পরীক্ষা করা সম্ভব। আক্রান্তের থুতু-লালা, মূত্র বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এই কারণেই সন্দেহজনক নমুনা পুণের মতো উচ্চমানের ল্যাবে পাঠানো হয়।
চিকিৎসা ও প্রতিষেধক পরিস্থিতি
এই মুহূর্তে নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট টিকা নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গের উপর নির্ভরশীল। গবেষকেরা নতুন প্রতিষেধক নিয়ে কাজ চালালেও এখনও তা সাধারণ ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছয়নি। চিকিৎসকদের মতে, নিপায় আক্রান্ত হলে বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, তাই আগাম সতর্কতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
সংক্রমণ এড়াতে কী করবেন
যেখানে নিপার সংক্রমণ নেই, সেখানে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা যায়। যেমন—
নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
খাবার খাওয়ার আগে ও নাকে-মুখে হাত দেওয়ার আগে পরিচ্ছন্ন থাকা
যেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে আরও কড়া সতর্কতা জরুরি—
মাঠে পড়ে থাকা বা কাটা ফল না খাওয়া
বাজার থেকে ফল কিনে ভাল করে ধুয়ে নেওয়া
কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলা
মাংস ভাল করে রান্না করা
শুয়োর ও অসুস্থ পশু থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
বাইরে বেরোলে এন৯৫ মাস্ক ব্যবহার করা
রোগীর সেবাকর্মীদের মাস্ক, গ্লাভস ও হাত ধোয়ার বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা
সচেতনতাই একমাত্র রক্ষা
নিপা ভাইরাস দ্রুত ছড়ায় এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই উপসর্গকে হালকা ভাবে না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ শনাক্ত হলে সংক্রমণ ছড়ানো রোখা সম্ভব এবং বহু প্রাণ বাঁচানো যেতে পারে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.