জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনও দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করলেও এতদিন বিষয়টিকে অনেকেই গুরুত্ব দেননি। কিন্তু সাম্প্রতিক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বিশ্ব উষ্ণায়ন যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে করোনার মতোই আরেকটি গ্লোবাল শকের মুখোমুখি হতে পারে মানবসভ্যতা। আর সেই শকের নাম হবে প্রাণঘাতী গরম।
গবেষণায় বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় যদি পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যেই বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা ভয়াবহ ও বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের কবলে পড়বে। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ভবিষ্যৎ আর কল্পবিজ্ঞান নয়—বরং দ্রুত এগিয়ে আসা এক কঠিন বাস্তব।
১.৫ ডিগ্রি পেরোলেই শুরু বিপর্যয়
অক্সফোর্ডের গবেষকরা জানিয়েছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি এতটাই দ্রুত যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করলেই তার মারাত্মক প্রভাব চোখে পড়তে শুরু করবে। বিদ্যুৎ ও শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়বে, জনস্বাস্থ্য পরিষেবা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এই গরম শুধু অস্বস্তি তৈরি করবে না—কমবে কর্মক্ষমতা, বাড়বে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে যেখানে বিশ্বের ২৩ শতাংশ মানুষ চরম গরমের মধ্যে বসবাস করতেন, আগামী কয়েক দশকে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪১ শতাংশে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দু’জনের মধ্যে একজন মানুষ সরাসরি এই তাপসঙ্কটের শিকার হতে পারেন।
ভারত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে
রিপোর্ট অনুযায়ী, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে পারে ভারত। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ায় কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়বে কৃষি, নির্মাণ, পরিবহণ ও অসংগঠিত শ্রমক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষমতা কমে যাবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে এবং অর্থনীতির উপর এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
শীতপ্রধান দেশগুলিও রেহাই পাবে না
এই সঙ্কট শুধু গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গবেষণায় বলা হয়েছে, তুলনামূলক ঠান্ডা জলবায়ুর দেশগুলিতেও ‘অস্বস্তিকর গরম দিনের’ সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। ২০০৬–২০১৬ সময়ের তুলনায় তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি বাড়ে, তাহলে অস্ট্রিয়া ও কানাডায় গরম দিনের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। ব্রিটেনে এই বৃদ্ধি ১৫০ শতাংশ, নরওয়েতে ২০০ শতাংশ এবং আয়ারল্যান্ডে প্রায় ২৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সমস্যা আরও গভীর কারণ এই দেশগুলির পরিকাঠামো মূলত ঠান্ডা আবহাওয়ার কথা ভেবে তৈরি। ফলে সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই ঘরবাড়ি, অফিস ও শহরজীবন বড় ধরনের চাপে পড়বে।
এসি বাড়বে, বাড়বে কার্বন নিঃসরণ
গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসুস লিজানা জানিয়েছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কুলিং ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়বে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই বহু ঠান্ডা দেশের বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এর ফল হবে দ্বিমুখী—বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে এবং কার্বন নিঃসরণ আরও বৃদ্ধি পাবে, যা আবার বিশ্ব উষ্ণতাকে ত্বরান্বিত করবে।
বিশ্ববাসীর জন্য ‘ওয়েক-আপ কল’
অক্সফোর্ড মার্টিন ফিউচার অফ কুলিং প্রোগ্রামের প্রধান ড. রাধিকা খোসলার মতে, এই রিপোর্ট বিশ্ববাসীর জন্য একটি স্পষ্ট ‘ওয়েক-আপ কল’। তাঁর কথায়, ১.৫ ডিগ্রির বেশি উষ্ণতা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং মানুষের বসবাসের ধরনে নজিরবিহীন পরিবর্তন আনবে।
গবেষকদের স্পষ্ট বার্তা—এই বিপর্যয় এড়াতে হলে টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং নেট-জিরো কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্য বাস্তবায়নই একমাত্র কার্যকর পথ। নচেৎ, করোনা পরবর্তী পৃথিবী হয়তো আরও এক ভয়াবহ গ্লোবাল শকের সাক্ষী হতে চলেছে—যার নাম হবে প্রাণঘাতী গরম।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.