দিঘার কাছাকাছি তালসারিতে ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু টলিপাড়ায় গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সমুদ্রের জলে ডুবে তাঁর মৃত্যু ঘিরে এখনও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘটনার পর থেকেই শুটিং চলাকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুমতি নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছিল কি না—এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে।

ওড়িশা পুলিশের প্রাথমিক সূত্রে জানা গেছে, তালসারিতে শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই দাবি সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে ওই জায়গায় শুটিং আয়োজন করা সম্ভব হল। অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া জরুরি।

সহকর্মীদের দাবি নিরপেক্ষ তদন্তের
ঘটনার পর অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, পুরো ঘটনাটি নিয়ে নিরপেক্ষ এবং বিস্তারিত পুলিশি তদন্ত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, শুটিং চলাকালীন নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন তা সমুদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হয়।
টলিপাড়ার অনেক শিল্পী ও কলাকুশলীও একই প্রশ্ন তুলছেন—ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিং করতে গেলে আদৌ কী ধরনের নিয়ম মেনে চলা উচিত এবং বাস্তবে সেগুলি কতটা মানা হয়।
প্রযোজকদের বক্তব্য: অনুমতি ও নিরাপত্তা বাধ্যতামূলক
কয়েকজন প্রযোজকের মতে, বাইরে শুটিং করতে গেলে একাধিক ধাপ অনুসরণ করা দরকার। যেমন—পুলিশের অনুমতি নেওয়া, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ বা ট্রাস্টের অনুমোদন নেওয়া এবং শুটিংয়ের ধরনের উপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা।
এক প্রযোজক জানান, শহরের মধ্যেও শুটিং করতে গেলে পুলিশের অনুমতি প্রয়োজন হয়। শহরের বাইরে গেলে সেই প্রয়োজন আরও বাড়ে। সঙ্গে রাখতে হয় প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা, ওষুধপত্র এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি।
আরেক প্রযোজকের কথায়, বাস্তবে অনেক সময় ধারাবাহিকের কাজ খুব দ্রুত এগোয়। কখনও কখনও চিত্রনাট্য লেখা হয় অল্প সময়ের মধ্যে, এবং পরের দিনই আউটডোর শুটিংয়ের পরিকল্পনা করতে হয়। তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে বিশেষ অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়। যদি জলে শুটিং থাকে, তখন ডুবুরি রাখার মতো কিছু প্রস্তুতিও নেওয়া হয়।
ফেডারেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে টেকনিশিয়ানদের সংগঠন বা ফেডারেশনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রযোজক ও পরিচালক স্বর্ণেন্দু সমাদ্দারের মতে, কোনও ধারাবাহিক শুরু হওয়ার আগে ফেডারেশনের কাছে কাজের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের তালিকা জমা দেওয়া হয়। আউটডোর শুটিংয়ের পরিকল্পনাও জানানো হয় ই-মেলের মাধ্যমে। ফেডারেশন অনুমোদন দেয় এই শর্তে যে সব নিয়ম মেনে কাজ করা হবে।
স্টুডিয়োর বাইরে অন্য কোথাও শুটিং করতে হলে সংশ্লিষ্ট জায়গার কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
স্বরূপ বিশ্বাসের বক্তব্যে উঠে এল অভিযোগ
ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস এই প্রসঙ্গে এক ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযোজনা সংস্থা সাধারণত শুধু জানায় যে আউটডোর শুটিং হবে, কিন্তু কোথায় বা কী ধরনের দৃশ্যের শুটিং করা হবে সেই বিস্তারিত তথ্য অনেক সময় দেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, আগে তো এই তথ্যও জানানো হত না। পরে বারবার দাবি তোলার ফলে এখন অন্তত আউটডোরে যাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু চিত্রনাট্য বা শুটিংয়ের সঠিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ ফেডারেশনের হাতে থাকে না বলেই দাবি তাঁর।
আরও অভিযোগ করে তিনি জানান, কখনও এই বিষয়ে প্রশ্ন তুললে প্রযোজনা সংস্থার তরফে নানা অজুহাত দেওয়া হয়। বলা হয়, শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বা চিত্রনাট্যের গোপনীয়তার কারণে সব জানানো সম্ভব নয়।
শিল্পী সংগঠনের নীরবতা
এই ঘটনার পর শিল্পী সংগঠন ‘আর্টিস্ট ফোরাম’-এর পক্ষ থেকেও কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি। সংগঠনের সম্পাদক শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশ্নের মুখে শুটিংয়ের বাস্তবতা
তালসারিতে যে ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল, সেটি একটি জনপ্রিয় প্রযোজনা সংস্থার তৈরি সিরিয়াল। কিন্তু ঘটনার পরও প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে জল্পনা আরও বেড়েছে।
রাহুল অরুণোদয়ের অকালমৃত্যুর পর এখন মূল প্রশ্ন—ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিংয়ে নিয়ম, অনুমতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র ঠিক কী? তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের উপরই এখন নজর টলিপাড়ার।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.