দু’দিন আগেও যেখানে অস্বাভাবিক ভিড়, কান্না আর শোকের আবহে ভারী হয়ে উঠেছিল পরিবেশ, সেখানে এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা চলছে। বিজয়গড়ের পল্লিশ্রী এলাকার মানুষজন আবার দোকান খুলছেন, চায়ের কাপে আড্ডা জমছে, রাস্তায় গাড়ি চলাচলও বাড়ছে। তবুও যেন সবকিছুতেই এক ধরনের নিঃশব্দ শূন্যতা রয়ে গেছে। কারণ, পাড়ার সকলের প্রিয় ‘বাবিন’ আর নেই।
অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু সংবাদ হঠাৎই এই ছোট্ট পাড়াটিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। রবিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত এলাকার চেহারা যেন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। বহু রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী এবং সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে ভিড়ে ভরে উঠেছিল গোটা এলাকা। এমনকি কিছু সময়ের জন্য আশপাশের অটো রুটও পরিবর্তন করা হয়েছিল।
স্মৃতিতে ভরা পাড়া, দেয়ালে দেয়ালে ছবি
এখন পাড়ার বিভিন্ন জায়গায় রাহুলের ছবি টাঙানো হয়েছে। কোথাও গলায় ফুলের মালা, কোথাও লেখা ‘বিদায় কমরেড’। অভিনেতার বাড়ির বিপরীত দিকেও বড় করে তাঁর একটি ছবি লাগানো হয়েছে। তিনতলার বারান্দা এখন নীরব। পরিবারের সদস্যরা শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জানা গেছে, বিদেশে থাকা অভিনেতার দাদা বুধবার দেশে ফেরার কথা, তাঁর অপেক্ষাতেই রয়েছেন পরিবারের সবাই।
পাড়ার বাসিন্দারা বলছেন, গত দু’দিন যেন কেউ ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত করতে পারেননি। অনেকেই রাহুলের বাড়ির আশেপাশেই সময় কাটিয়েছেন। কারও কাছে তিনি ছিলেন পাড়ার ছেলে, কারও কাছে ছোট ভাই বা বন্ধুর মতো।
‘তারকা’ হয়েও ছিলেন একেবারে সাধারণ মানুষ
পাড়ার প্রবীণ স্বপন মজুমদার, যাঁকে সবাই ‘ভাইয়াদা’ নামে চেনেন, বলেন রাহুল কখনও তারকাসুলভ আচরণ করেননি। রাস্তায় দেখা হলেই খোঁজ নিতেন, খুবই ভদ্র এবং শান্ত স্বভাবের ছিলেন। তাঁর কথায়, এত মানুষের ভালোবাসা দেখে বোঝা গেছে পাড়ার কাছে রাহুল কতটা প্রিয় ছিলেন।

চায়ের দোকানি রবিনের স্মৃতিতেও রাহুল খুব কাছের মানুষ। প্রায়ই তাঁর দোকানে এসে চিনি ছাড়া লাল চা খেতেন। কখনও জিমের সময় কালো কফিও নিতেন। রাহুলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি গাড়ি ভাড়া করে তমলুক পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু শেষমেশ সেই সুযোগ পাননি। এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি। জানান, তাঁর ছেলে বড় হয়ে অভিনেতা হতে চায়, আর রাহুল নাকি একদিন সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ও রাজনৈতিক বিতর্ক
রাহুলের মৃত্যুর পর শুটিং চলাকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাড়ার অনেকেই। তাঁদের মতে, এমন দুর্ঘটনা কেন ঘটল, তা নিয়ে স্পষ্ট উত্তর দরকার।
এদিকে অভিনেতার মরদেহ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা মনে করেন, রাহুল কোনও এক দলের নন, তিনি সবারই প্রিয় ‘বাবিন’। তাই এই বিষয়টি অনেকের ভালো লাগেনি।
শৈশবের বন্ধুদের স্মৃতিতে রাহুল
পাড়ারই বাসিন্দা এবং রাহুলের ছোটবেলার বন্ধু কচি জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব। নানা দুষ্টুমি, আড্ডা—সবকিছুর স্মৃতি আজও ভাসছে চোখে। সম্প্রতি রাহুল নতুন একটি বাইক কিনেছিলেন। সেই বাইক নিয়েও তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছিল। কচির কথায়, শুটিংয়ে যাওয়ার আগে রাহুল বলেছিলেন ফিরে এসে আবার দেখা হবে। সেই কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে।
বন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ধর্ম বা জাতপাত নিয়ে রাহুল কখনও কোনও ভেদাভেদ করেননি। সকলের সঙ্গে সমানভাবে মিশতেন।
পাড়ার এক কোণে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে নতুন বাইক

পল্লিশ্রীতে এখন সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। মোমোর দোকান খুলছে, কেউ খবরের কাগজ পড়ছেন, কেউ দোকান সামলাচ্ছেন। তবে সবকিছুই যেন অনেকটা নীরবতার মধ্যে।
আর সেই নীরবতার মাঝেই কদম গাছের নীচে একা দাঁড়িয়ে আছে রাহুলের সদ্য কেনা বাইক। সেটিই যেন এখন পাড়ার মানুষের কাছে তাঁর উপস্থিতির এক নিঃশব্দ স্মৃতি হয়ে আছে। পাড়ার অনেকেই দাঁড়িয়ে সেই বাইকের দিকে তাকিয়ে বলছেন—এত কম বয়সে এমন বিদায় কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.