প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী বিভা সেনগুপ্ত। মঙ্গলবার সকালে শহরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। বেশ কিছু দিন ধরেই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন প্রবীণ শিল্পী। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণেই তাঁর মৃত্যু বলে জানা গিয়েছে। তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবণী সেন।
মঙ্গলবার সকাল ৭টা নাগাদ হাসপাতালে মৃত্যু হয় বিভা সেনগুপ্তের। শ্রাবণী সেন জানান, সাধারণভাবে বিভা সেনগুপ্ত সুস্থই ছিলেন। তবে মাঝেমধ্যেই তাঁকে রক্ত দিতে হত। সম্ভবত হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকার সমস্যাও ছিল। তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে সঙ্গীতজগতে। সঙ্গীতশিল্পী অলক রায়চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ‘লোকভারতী’-র পক্ষ থেকে বিভা সেনগুপ্তকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেদিনও তাঁকে যথেষ্ট স্বতঃস্ফূর্ত দেখিয়েছিল বলে জানান তিনি।
দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে বিভা সেনগুপ্ত কখনও খ্যাতির প্রতিযোগিতায় নিজেকে সামিল করেননি। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে যখন সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেনের মতো শিল্পীরা রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে শীর্ষে, তখন অনেকটাই আড়ালে থেকে গিয়েছিলেন বিভা। তবে নিজের গানের সাধনা থেকে কখনও সরে আসেননি তিনি।
জীবনের শেষ দশ-বারো বছরে নতুন করে পরিচিতি পান শিল্পী। তাঁর গান ও সঙ্গীতসাধনা নিয়ে আগ্রহ বাড়ে শ্রোতাদের। যদিও প্রচারের আলো নিয়ে তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। বরং নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের গান শেখানো এবং সঙ্গীতচর্চাতেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। প্রতি বছর তাঁর সঙ্গীতগুরু দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মদিনও নিয়ম করে পালন করতেন তিনি।
১৯৫৯ সালে কলকাতায় আসেন বিভা সেনগুপ্ত। জন্মসূত্রে তিনি ত্রিপুরার বাসিন্দা। কলকাতায় এসে মায়া সেনের কাছে দীর্ঘদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিম নেন। পরবর্তীতে মায়া সেনই তাঁকে নিয়ে যান দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। বিভার গান শুনে মুগ্ধ হন দেবব্রত। এরপর তাঁর সান্নিধ্যে থেকে গান শেখার সুযোগ পান শিল্পী। বিভা সেনগুপ্তের গায়কিতে দেবব্রত বিশ্বাসের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। খোলা গলায় গান গাওয়া, পরিষ্কার উচ্চারণ এবং গানের কথাকে শ্রোতার সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরার বিশেষ ক্ষমতা ছিল তাঁর। বয়স বাড়লেও তাঁর গায়কিতে সেই ঋজুতা ও দৃঢ়তা শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল।
সঙ্গীতশিল্পী মনোময় ভট্টাচার্যও বিভা সেনগুপ্তের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত স্নেহের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে মনোময় জানান, বিভা তাঁকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। তাঁর গান নিয়েও মুগ্ধ ছিলেন মনোময়। বিশেষ করে প্রবীণ বয়সেও তাঁর সুরের নিখুঁত ব্যবহার এবং টপ্পার দানাগুলির স্বচ্ছতা তাঁকে বিস্মিত করত। শ্রীকান্ত আচার্যের সঙ্গেও বিভা সেনগুপ্তের ছিল গভীর স্নেহের সম্পর্ক। দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে তাঁর আমন্ত্রণে একাধিকবার গান গেয়েছেন শ্রীকান্ত। তাঁর স্মৃতিতে বিভা ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক এবং উদার মনের মানুষ। কোনও শিল্পীর গান পছন্দ হলে নিজেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশংসা করতেন।
জীবনের শেষ কয়েক বছর শারীরিক নানা সমস্যার মধ্যেও গান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি বিভা সেনগুপ্ত। চোখের সমস্যা, কিছুটা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া এবং নিকটজন হারানোর শোক—কোনও কিছুই তাঁর সঙ্গীতসাধনাকে থামাতে পারেনি। শেষ বয়সেও তাঁর কণ্ঠে ছিল গানের সেই স্বচ্ছতা ও অনুভব।
বিভা সেনগুপ্তের প্রয়াণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে তৈরি হল এক গভীর শূন্যতা। তাঁর কণ্ঠ, গায়কির স্বাতন্ত্র্য এবং দীর্ঘ সঙ্গীতসাধনা শ্রোতাদের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.