একটি ঘরে খেলা করছে ছোট্ট শিশু, আর সেই ঘরেই কিছুটা দূরে মা বা বাবা পোশাক বদল করছেন—অনেক পরিবারেই এই দৃশ্য খুব স্বাভাবিক। কিন্তু প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস সন্তানের জন্য মোটেও নিরাপদ বা স্বাস্থ্যকর নয়। বরং এটি শিশুর মানসিক গঠন, ব্যক্তিগত সীমারেখা বোঝা এবং ভবিষ্যৎ আচরণের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনুরাধা সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশিত এক ভিডিওতে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান সমাজে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকল শিশুই কমবেশি যৌন হেনস্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকেই শিশুকে এমন অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়। তাই খুব ছোট বয়স থেকেই শিশুকে শরীরের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত স্পর্শ এবং সীমা সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি।
এই কারণেই এখন স্কুলে এবং বাড়িতে শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর শিক্ষা দেওয়া হয়। তবে এই শিক্ষা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অভিভাবকদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও তা মেনে চলতে হবে। শিশুকে যদি বোঝানো হয় যে সবার সামনে পোশাক বদল করা অনুচিত, তাহলে অভিভাবকদেরও সেই নিয়ম নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। নচেৎ শিশুর কাছে বার্তাটি বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।
ডাঃ অনুরাধার মতে, শিশুকে স্পর্শের শিক্ষা দিতে গেলে আগে তাকে শারীরিক গোপনীয়তার ধারণা দিতে হবে। কোন জায়গাগুলো ব্যক্তিগত, কেন সেগুলো ঢেকে রাখা দরকার—এই বোঝাপড়া না থাকলে ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর সেই শিক্ষা দিতে গেলে বাবা-মায়ের নিজেদের পোশাক বদলের সময় আলাদা ঘরে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:Lifestyle: বর্ষবরণের রাতপার্টিতে স্টাইল স্টেটমেন্ট: কী পরলে নজর কাড়বেন নারী–পুরুষ?
বিশেষজ্ঞ আরও জানান, সকলের সামনে পোশাক পরিবর্তনের অভ্যাস শিশুকে নিজের ও অন্যের প্রতি সম্মান করতে শেখায় না। বরং ছোট থেকেই তাকে বোঝানো উচিত—কারও পোশাক বদলের সময় সেই ঘরে থাকা ঠিক নয়। একইসঙ্গে, শিশু নিজে যখন পোশাক বদল করবে, তখনও যেন সে দরজা বন্ধ রাখে বা কাউকে ঘরে ঢুকতে না দেয়—এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন:Lifestyle : হাঁটাহাঁটি নয়, ১টি নিয়মেই কমবে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি! নতুন বছরে মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার সহজ উপায়
সন্তানের বয়স যখন ১০ বছরের বেশি হয়, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই বয়স থেকেই ধীরে ধীরে কৈশোর শুরু হয়, শরীর ও মনে নানা পরিবর্তন আসে। স্বাভাবিকভাবেই যৌনতা নিয়ে কৌতূহল জাগে। সেই সময়ে অন্যের উন্মুক্ত শরীর দেখলে শিশুর মনে ভুল বা বিশ্রী ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই এই বয়সের পরে তো বটেই, তার আগেও শিশুর সামনে পোশাক বদল না করাই শ্রেয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ছোট বয়স থেকেই এই নিয়ম শেখালে শিশুকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হয় না। বাবা-মা পোশাক বদল করছেন বুঝলেই সে নিজে থেকেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। এই অভ্যাসকে বিরক্তিকর নয়, বরং সফল অভিভাবকত্বের লক্ষণ হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ, এর অর্থ হল—আপনার সন্তান ব্যক্তিগত সীমা, গোপনীয়তা এবং সম্মানবোধ শিখে ফেলেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য বাবা-মায়ের এই ছোট ছোট সচেতন অভ্যাসই বড় ভূমিকা পালন করে। পোশাক বদল করার সময় আলাদা ঘরে যাওয়া—শুনতে ছোট বিষয় হলেও, সন্তানের জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর।