বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর—খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিন। তবে এই উৎসব শুধু একটি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আজ বড়দিন মানেই আনন্দ, আলো, সাজসজ্জা আর উপহারের উৎসব। শহর থেকে গ্রাম—বাড়ি, অফিস, দোকান, রাস্তা-ঘাট সর্বত্রই চোখে পড়ে ক্রিসমাস ট্রি, সান্তা ক্লজের মূর্তি আর রঙিন আলোয় মালা।
বড়দিনের আগের দিন, অর্থাৎ ২৪ ডিসেম্বর ‘ক্রিসমাস ইভ’। এই রাত থেকেই চারদিকে ভেসে আসে ক্যারলের সুর। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতেই লাল-সাদা পোশাকে, সাদা দাড়িওয়ালা এক মোটা-সোটা মানুষ স্লেজ গাড়িতে চেপে ঘরে ঘরে এসে পৌঁছন—তিনি সান্তা ক্লজ। তার কাঁধে থাকে বিশাল উপহারের ঝোলা, আর স্লেজ টানে বল্গা হরিণ। শিশুদের পাশাপাশি বহু প্রাপ্তবয়স্ক আজও বিশ্বাস করেন, সান্তা ক্লজ চুপিচুপি এসে তাদের জন্য উপহার রেখে যান।
এই বিশ্বাস থেকেই বহু পরিবারে ক্রিসমাস ইভে ঘরের এক কোণে বা বালিশের পাশে মোজা ঝুলিয়ে রাখার রীতি চলে আসছে। আশা থাকে—সকালে ঘুম ভাঙলেই সেই মোজায় মিলবে সান্তার উপহার। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই মোজা ঝুলিয়ে রাখার রীতি শুরু হল কীভাবে?
এই প্রথার শিকড় গিয়ে পৌঁছয় চতুর্থ শতাব্দীর তুরস্কে, তৎকালীন এশিয়া মাইনরে। সেখানেই বাস করতেন সেন্ট নিকোলাস নামে এক বিত্তশালী ও দয়ালু ব্যক্তি। ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারালেও তিনি দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন নিঃস্বার্থভাবে। অনেক সময় গোপনে দরিদ্রদের বাড়িতে উপহার রেখে আসতেন, যাতে কেউ তার পরিচয় জানতে না পারে।
একটি জনপ্রিয় কাহিনি অনুযায়ী, এক ব্যক্তি অর্থাভাবে তার তিন মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না। এই খবর জানতে পেরে সেন্ট নিকোলাস রাতের অন্ধকারে তার বাড়ির ছাদে উঠে চিমনির ভিতর দিয়ে সোনা ভর্তি থলি ফেলে দেন। সেই দিন ঘটনাচক্রে বাড়ির লোকেরা চিমনির কাছে মোজা শুকোতে দিয়েছিল। সোনার থলিটি সেই মোজার মধ্যেই পড়ে যায়। এভাবে তিনি তিনবার গোপনে সাহায্য করেছিলেন। শেষবার অবশ্য সেই ব্যক্তি নিকোলাসকে দেখে ফেলেন, কিন্তু নিকোলাস সাহায্যের কথা গোপন রাখার অনুরোধ জানান।
এই ঘটনার পর থেকেই গোপনে উপহার পাওয়ার সঙ্গে নিকোলাসের নাম জড়িয়ে যায়। ধীরে ধীরে তার গল্প ছড়িয়ে পড়ে তুরস্কের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ ও বিশ্বের নানা প্রান্তে। সেন্ট নিকোলাস পরিচিত হন ফাদার নিকোলাস বা পরবর্তীকালে সান্তা ক্লজ নামে।
এদিকে বড়দিনে উপহার আদান-প্রদানের আরেকটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাও রয়েছে। বাইবেলের কাহিনি অনুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মের পর তিনজন জ্ঞানী ব্যক্তি আকাশের তারা অনুসরণ করে বেথেলহামে পৌঁছান এবং তাঁকে সোনা, ধূপ ও গন্ধরস উপহার দেন। সেই থেকেই বড়দিনে উপহার দেওয়ার প্রথা গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়।
আজও কানাডার মুস্কোকা গ্রামকে বলা হয় সান্তা ক্লজের বাড়ি। সেখানে সান্তার নামে একটি বিশেষ মেইলিং পোস্ট রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ চিঠি পৌঁছায়। এই ডাক কোডটি হল ‘H0H0H0’—সান্তার সেই বিখ্যাত ‘হো হো হো’ হাসির স্মরণে।
সব মিলিয়ে, বড়দিনের আগের রাতে মোজা ঝুলিয়ে রাখার রীতি শুধু একটি কল্পকাহিনি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দয়া, নিঃস্বার্থতা আর আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। তাই বড়দিন মানেই শুধু উপহার নয়—মানবিকতার উৎসবও।