পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা প্রথম দর্শনে সাধারণ মনে হলেও পরবর্তী সময়ে গোটা মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। তেমনই এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিল কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট জাহাজ—মে ফ্লাওয়ার। কোনও যুদ্ধজাহাজ নয়, কোনও রাজকীয় বহরও নয়; তবুও এই সাধারণ জাহাজই ১৭ শতকে আমেরিকার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
১৬২০ সালের ১৮ ডিসেম্বর ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে মে ফ্লাওয়ার। জাহাজটিতে ছিলেন মোট ১০২ জন যাত্রী ও প্রায় ৩০ জন নাবিক। যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন এমন মানুষ, যারা ইউরোপে ধর্মীয় একাধিপত্য, সামাজিক বিধিনিষেধ ও রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে চাইছিলেন। তাঁদের একমাত্র স্বপ্ন ছিল—নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী বাঁচার অধিকার।
আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়া সেই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ছোট্ট জাহাজে মাসের পর মাস কাটানো মানে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। ঝড়, প্রবল হাওয়া, খাদ্যের অভাব এবং অসুস্থতা নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। অনেক যাত্রী সেই কঠিন যাত্রাপথে প্রাণ হারান। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে মে ফ্লাওয়ার তার নির্ধারিত গন্তব্য ভার্জিনিয়ার বদলে পৌঁছে যায় আজকের ম্যাসাচুসেটসের প্লাইমাউথ এলাকায়।
তীরে নামার আগেই যাত্রীরা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। নিজেদের মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে তাঁরা ‘মে ফ্লাওয়ার কম্প্যাক্ট’ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা স্বশাসন, আইনের শাসন এবং সমবেত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতিকে স্বীকৃতি দেন। পরবর্তীকালে এই চুক্তিকেই আমেরিকান গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।
প্লাইমাউথে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরও কঠিন লড়াই। প্রচণ্ড ঠান্ডা, খাদ্যের সংকট এবং অপরিচিত পরিবেশে বহু মানুষ প্রাণ হারান। তবে যারা বেঁচে ছিলেন, তারা স্থানীয় আদিবাসীদের সাহায্যে কৃষিকাজ, শস্য চাষ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের কৌশল শিখে নেন। সংঘর্ষের পাশাপাশি সহযোগিতার এই অধ্যায়ই ভবিষ্যতে ‘থ্যাংকস গিভিং’ উৎসবের জন্ম দেয় বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
মে ফ্লাওয়ার কোনও অস্ত্রের শক্তিতে ইতিহাস বদলায়নি। বদলে দিয়েছে মানুষের সাহস, আশা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। এই জাহাজ হয়ে উঠেছিল নিপীড়ন থেকে মুক্তির প্রতীক, নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্নের বাহন। তাই একটি সাধারণ কাঠের জাহাজ হয়েও মে ফ্লাওয়ার আজও পৃথিবীর ইতিহাসে এক অসাধারণ গুরুত্ব বহন করে।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.