বয়স বাড়লে অস্থিসন্ধির ব্যথা হবে— এমন ধারণা এখনও অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এখন কমবয়সিদের মধ্যেও হাঁটু, কোমর, গোড়ালি কিংবা কাঁধের জোড়ে ব্যথার সমস্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে থাকা, আচমকা অতিরিক্ত শরীরচর্চা কিংবা অনুপযুক্ত জুতো পরার মতো অভ্যাসই অনেক সময় এই সমস্যাকে ডেকে আনে। ফলে ব্যথা শুরু হওয়ার পর শুধু ওষুধ খেয়ে সাময়িক আরাম মিললেও, আসল কারণ দূর না হলে সমস্যা থেকেই যায়।
ব্যথা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করা চিকিৎসকদের মতে, অস্থিসন্ধির সমস্যা কমাতে হলে জীবনযাপনের কয়েকটি সাধারণ ভুল আগে চিহ্নিত করতে হবে। কারণ দিনের পর দিন ছোট ছোট ভুলই পরে বড় ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ওয়ার্ম আপ না করে শরীরচর্চা শুরু করা
অনেকেই ব্যায়াম শুরু করার আগে সরাসরি দৌড়, ভারোত্তোলন বা কঠিন শরীরচর্চায় নেমে পড়েন। এতে পেশি ও অস্থিসন্ধির উপর আচমকা চাপ পড়ে। শরীর তখন সেই চাপ নেওয়ার জন্য তৈরি থাকে না। ফলে হাঁটু, গোড়ালি, কোমর বা কাঁধে টান লাগা, ব্যথা বা প্রদাহ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
ব্যায়ামের আগে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট শরীর গরম করা জরুরি। হালকা স্ট্রেচিং, ধীরে হাঁটা, হাত-পা নাড়ানো বা সহজ কিছু নড়াচড়া করলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে। রক্ত চলাচলও সক্রিয় হয়। তখন পেশি নমনীয় হয় এবং জোড়ের উপর চাপ কিছুটা কমে।
শরীরচর্চার আগে এই প্রস্তুতির অভাব থাকলে ছোট চোটও বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই হাঁটু বা কোমরের ব্যথা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা আরও বেশি প্রয়োজন।
বিরতির পর হঠাৎ অতিরিক্ত ব্যায়াম বিপজ্জনক
অনেকেই কয়েক দিন নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তারপর কাজের চাপে বা অন্য কারণে এক-দু’সপ্তাহ বিরতি চলে আসে। পরে আবার ব্যায়াম শুরু করতে গিয়ে প্রথম দিনেই আগের মতো বা তার থেকেও বেশি পরিশ্রম করে ফেলেন। এই অভ্যাস অস্থিসন্ধির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
দীর্ঘ বিরতির পর শরীর আগের মতো সক্রিয় থাকে না। পেশির শক্তি ও নমনীয়তা কমে যায়। সেই অবস্থায় হঠাৎ বেশি দৌড়, স্কোয়াট, সিঁড়ি ওঠা-নামা বা ভারী ওজন তোলা শুরু করলে জোড়ে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে হাঁটু, কোমর বা গোড়ালিতে ব্যথা শুরু হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, বিরতির পরে শরীরচর্চা ধীরে ধীরে শুরু করতে হবে। প্রথম কয়েক দিন কম সময় ও কম চাপের ব্যায়াম করতে হবে। তারপর ধাপে ধাপে সময় ও পরিশ্রম বাড়ানো উচিত। এতে শরীর নতুন করে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
দীর্ঘ সময় একভাবে বসে থাকা
বর্তমান সময়ে অফিসের কাজ, পড়াশোনা বা মোবাইল-কম্পিউটারের কারণে অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকেন। আবার অনেক বয়স্ক মানুষ চলাফেরা কম করে দিনের বড় অংশ বিছানা বা চেয়ারে কাটান। এই অভ্যাসও অস্থিসন্ধির ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় বসে থাকলে শরীরে রক্ত চলাচল ধীর হয়ে যায়। হাঁটু ও কোমরের নড়াচড়া কমে যায়। ফলে অস্থিসন্ধির ভিতরে থাকা সাইনোভিয়াল ফ্লুইড ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। এই তরলই জোড়কে পিচ্ছিল রাখে এবং তরুণাস্থিকে সুরক্ষা দেয়।
যখন শরীর নড়াচড়া করে না, তখন পেশিও শক্ত হয়ে যেতে শুরু করে। পেশি দুর্বল বা শক্ত হয়ে গেলে শরীরের ওজনের চাপ সরাসরি অস্থিসন্ধির উপর পড়ে। তখন ব্যথা আরও বাড়ে।
তাই টানা বসে কাজ করলে প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট অন্তর উঠে দাঁড়ানো দরকার। কয়েক মিনিট হাঁটা, শরীর টানটান করা বা হালকা স্ট্রেচ করলে উপকার পাওয়া যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও সারাদিন শুয়ে বা বসে না থেকে যতটা সম্ভব অল্প অল্প করে হাঁটার অভ্যাস রাখা জরুরি। 🚶♂️
ভুল জুতোও বাড়িয়ে দেয় ব্যথা
শুধু শরীরচর্চা বা বসে থাকা নয়, পায়ের জুতোও অস্থিসন্ধির ব্যথার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় উঁচু হিলের জুতো পরলে পায়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। গোড়ালি সবসময় উঁচু অবস্থায় থাকায় হাঁটু ও কোমরের উপর বাড়তি চাপ পড়ে।
এর ফলে শুধু পায়ে নয়, ধীরে ধীরে হাঁটু, কোমর এবং পিঠেও ব্যথা শুরু হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চলতে থাকলে জোড়ের ক্ষয়ও দ্রুত হতে পারে।
আবার অনেক সময় সমতল কিন্তু শক্ত সোলের জুতো কিংবা পর্যাপ্ত কুশনিং নেই এমন জুতো পরলেও সমস্যা হয়। জুতো যদি হাঁটার সময় ধাক্কা শোষণ করতে না পারে, তবে সেই চাপ সরাসরি হাঁটু ও কোমরে গিয়ে লাগে।
তাই এমন জুতো বেছে নেওয়া উচিত যা পায়ের সঙ্গে মানানসই, আরামদায়ক এবং যাতে যথেষ্ট কুশন থাকে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হলে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
খাবার ও পুষ্টির অভাবেও বাড়তে পারে সমস্যা
অনেক সময় অস্থিসন্ধির ব্যথার পিছনে শরীরের কিছু প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতিও দায়ী থাকে। ভিটামিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা কোলাজেনের অভাব হলে হাড় ও তরুণাস্থি দুর্বল হতে শুরু করে। তখন জোড়ে ব্যথা ও অস্বস্তি বাড়তে পারে।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। অনেক সময় জোড়ে ব্যথার প্রধান কারণই হল প্রদাহ। তাই মাছ, বাদাম, বীজ বা চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে কোলাজেন তরুণাস্থিকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এর অভাব হলে অস্থিসন্ধির ক্ষয় দ্রুত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক কোলাজেন বা ভিটামিনের সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে নিজের ইচ্ছামতো সাপ্লিমেন্ট শুরু করা উচিত নয়। আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে তবেই প্রয়োজন অনুযায়ী তা গ্রহণ করা উচিত।
ব্যথা কমাতে কী কী বদল জরুরি?
অস্থিসন্ধির ব্যথা কমাতে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে:
ব্যায়ামের আগে অবশ্যই ওয়ার্ম আপ করুন।
দীর্ঘ বিরতির পর ধীরে ধীরে শরীরচর্চা শুরু করুন।
টানা বসে থাকবেন না, মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন।
আরামদায়ক ও কুশনযুক্ত জুতো ব্যবহার করুন।
খুব বেশি সময় হাই হিল পরে থাকবেন না।
শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছচ্ছে কি না, সে দিকে নজর দিন।
দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অস্থিসন্ধির ব্যথা অনেক সময় বয়সের কারণে নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের কারণেই বাড়ে। তাই শুরুতেই যদি ছোট ছোট ভুল শুধরে নেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব। নিয়মিত নড়াচড়া, সঠিক শরীরচর্চা, উপযুক্ত জুতো ও সুষম খাবার— এই কয়েকটি বিষয়েই লুকিয়ে আছে সুস্থ অস্থিসন্ধির চাবিকাঠি।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.