দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের জীবনে অন্ধকারই বাস্তবতা। এতদিন পর্যন্ত কর্নিয়া প্রতিস্থাপনই ছিল প্রধান ভরসা, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেমন জটিল, তেমনই ঝুঁকিপূর্ণ। সব ক্ষেত্রে সফলতাও নিশ্চিত নয়। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন আশার আলো হিসেবে উঠে এসেছে ‘বায়োনিক আই’ বা যান্ত্রিক চোখ প্রযুক্তি।
বায়োনিক আই কী?
বায়োনিক আই মূলত একটি উন্নত নিউরোপ্রস্থেটিক ডিভাইস, যা মানুষের চোখের কাজকে আংশিকভাবে নকল করতে সক্ষম। এটি আলোর সঙ্কেত গ্রহণ করে সেটিকে বৈদ্যুতিক সঙ্কেতে রূপান্তরিত করে এবং সেই তথ্য মস্তিষ্কে পাঠায়। ফলে মস্তিষ্ক সেই সঙ্কেত বিশ্লেষণ করে একটি দৃশ্য তৈরি করতে পারে।
এই প্রযুক্তিতে সাধারণত দুটি প্রধান অংশ থাকে—
একটি ক্ষুদ্র চিপ, যা চোখে প্রতিস্থাপন করা হয়
একটি ক্যামেরাযুক্ত চশমা, যা বাইরের দৃশ্য ধারণ করে
ক্যামেরা থেকে পাওয়া তথ্য প্রসেসরের মাধ্যমে চিপে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে অপটিক স্নায়ুর সাহায্যে মস্তিষ্কে পাঠানো হয়।
কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
স্বাভাবিক চোখে রেটিনা আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে ছবি তৈরি করে। কিন্তু বায়োনিক আই-এ এই কাজটি সম্পন্ন হয় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে। ক্যামেরা বাইরের দৃশ্য ধারণ করে এবং সেই ডেটা বৈদ্যুতিক সঙ্কেতে রূপান্তরিত হয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি ধীরে ধীরে চারপাশের আকার, আলো-ছায়া এবং কিছু ক্ষেত্রে বস্তু চিনতে পারেন।
যদিও এই দৃষ্টি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চোখের মতো স্পষ্ট নয়, তবুও এটি একজন অন্ধ ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কোন রোগে কার্যকর?
বায়োনিক আই বিশেষ করে কিছু জটিল চোখের রোগে কার্যকর হতে পারে, যেমন—
বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা
এই রোগগুলিতে রেটিনার কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে দৃষ্টিশক্তি কমতে কমতে একসময় সম্পূর্ণ হারিয়ে যেতে পারে। বায়োনিক আই এই ক্ষতিগ্রস্ত কোষের কাজ আংশিকভাবে পূরণ করতে পারে।
কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের বিকল্প?
প্রচলিত কর্নিয়া প্রতিস্থাপন একটি জটিল অস্ত্রোপচার। মৃত দাতার চোখ থেকে কর্নিয়া সংগ্রহ করে তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রতিস্থাপন করতে হয়। সামান্য ত্রুটিতেই অপারেশন ব্যর্থ হতে পারে।
তার তুলনায় বায়োনিক আই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এতে দাতার ওপর নির্ভরতার প্রয়োজনও কমে যায়।
গবেষণা ও বর্তমান অগ্রগতি
* বিশ্বের একাধিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যেমন—
* Monash University
* Harvard University
* Johns Hopkins University
* University of Southern California
ভারতেও এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে, বিশেষ করে চেন্নাই ও হায়দরাবাদের কিছু প্রতিষ্ঠানে।
এছাড়া ‘Argus II retinal prosthesis system’ নামের একটি রেটিনাল প্রস্থেটিক ইতিমধ্যেই মার্কিন FDA-এর অনুমোদন পেয়েছে, যা এই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের দিকটি আরও শক্তিশালী করেছে।
সীমাবদ্ধতা কী?
যদিও বায়োনিক আই অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তবুও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—
সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে পারে না
ছবি কিছুটা অস্পষ্ট হতে পারে
দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এখনও গবেষণাধীন
তবে বর্তমান পর্যায়ে এটি দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বস্তু চেনার ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হতে পারে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
গবেষকেরা আশাবাদী যে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে। উন্নত সেন্সর, দ্রুত প্রসেসিং এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে আরও নিখুঁত সংযোগ তৈরি হলে একদিন হয়তো সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
উপসংহার
বায়োনিক আই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি দৃষ্টিহীন মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে অন্ধত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.