চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত-কে ঘিরে নতুন করে আবেগে ভাসছে বাংলা সংস্কৃতি জগৎ। তাঁর প্রয়াণের পর এক আবেগঘন স্মৃতিচারণায় বিজ্ঞানী বন্ধু পর্ণালী তুলে ধরলেন অনীক দত্তর ব্যক্তিত্বের এক একেবারেই ভিন্ন দিক— যেখানে ছিলেন তীব্র রসবোধ, আপসহীন সততা, তর্কপ্রিয়তা এবং নতুন প্রযুক্তি ও ‘এআই’ নিয়ে অসীম কৌতূহল।
পর্ণালী বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে কর্মসূত্রে থাকেন। তিনি জানিয়েছেন, কোভিড সময়েই ফেসবুকের মাধ্যমে প্রথম আলাপ হয়েছিল অনীক দত্তর সঙ্গে। সেই সময় পরিচালক তাঁর শারীরিক কিছু সমস্যার বিষয়ে জানতে ফোনে কথা বলতে চেয়েছিলেন। প্রথম আলাপেই অনীক দত্তর রসবোধ তাঁকে চমকে দিয়েছিল। কথার মাঝেই মজা করে বলেছিলেন, “তোমাকে বিজ্ঞানী মনে হয় না, চশমা নেই!” আর সেই হাসি-মজার আড়ালেই ছিল গভীর ব্যক্তিত্ব ও স্পষ্টবাদিতা।
পর্ণালীর কথায়, অনীক দত্ত ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি সত্য কথা বলতে কোনওদিন ভয় পেতেন না। তিনি মনে করেন, বর্তমান সমাজে যেখানে তথ্য বিকৃতি ও সুবিধাবাদ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, সেখানে অনীক দত্ত ছিলেন ব্যতিক্রম। নিজের ক্ষতি হলেও তিনি নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন। তাঁর মুখে প্রায়ই শোনা যেত, “আমি মিথ্যে বলতে পারি না।”
পরিচালকের ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়েও স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে নানা তথ্য। খ্যাতিমান পরিবারে জন্ম হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ইউবিআই ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের পরিবার এবং কিংবদন্তি পরিচালক বিমল রায়ের আত্মীয় হয়েও কোনও আড়ম্বর ছিল না তাঁর জীবনে। দক্ষিণ কলকাতার ডোভার লেনের বাড়িতে তিনি সাদামাটা পরিবেশেই থাকতে ভালোবাসতেন।
তর্ক করতে ভীষণ ভালোবাসতেন অনীক দত্ত। তবে সেই তর্ক কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং যুক্তি ও চিন্তার আদানপ্রদান ছিল। পর্ণালী জানিয়েছেন, তিনি প্রায়ই সমাজ, রাজনীতি, কলকাতার বদলে যাওয়া চেহারা কিংবা সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ ভয়েস মেসেজ পাঠাতেন। শহরের পরিবর্তন তাঁকে কষ্ট দিত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নিজের কাজ নিয়েও ছিলেন আত্মসমালোচক। দর্শকদের কাছে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ যতটা জনপ্রিয়, অনীক দত্ত নিজে নাকি বেশি ভালোবাসতেন ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ এবং ‘বরুণবাবুর বন্ধু’-কে। নিজের ছবির সমালোচনা শুনতেও দ্বিধা করতেন না, বরং তর্কে জড়িয়ে পড়তেন আনন্দ নিয়ে।
পর্ণালীর পরিবারের সঙ্গেও তৈরি হয়েছিল গভীর সম্পর্ক। তাঁর ছোট মেয়ের হাতেখড়িও করিয়েছিলেন অনীক দত্ত। সেই সময়ও নিজের স্বভাবসিদ্ধ হাস্যরস বজায় রেখে বলেছিলেন, “আমার মতো তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষকে দিয়ে হাতেখড়ি করাচ্ছ কেন?” ছোটদের শক্তি ও কৌতূহল তাঁকে মুগ্ধ করত। শিশুদের অফুরন্ত এনার্জিকে বিজ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাতে পারে, তা নিয়েও তিনি ভাবতেন বলে জানিয়েছেন পর্ণালী।
শেষ দিকের আড্ডাগুলোর বড় অংশ জুড়ে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। শুধু জানতেনই না, আরও জানতে চাইতেন। পর্ণালীর কথায়, “এআই নিয়ে অনীকদার প্রচুর জ্ঞান ছিল, আর শেখার আগ্রহ ছিল আরও বেশি।”
জানা গিয়েছে, অনীক দত্তকে নিয়ে একটি বই লেখার কাজও শুরু করেছিলেন পর্ণালী। সেই বই মূলত পরিচালক অনীক দত্তকে নয়, বরং মানুষ অনীক দত্তর ছোটবেলা, পরিবার এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হওয়ার কথা ছিল। বইয়ের সম্ভাব্য নামও নাকি নিজেই ঠিক করেছিলেন পরিচালক— “টুকরো টুকরো ফ্ল্যাশব্যাক”।
এখন সেই বই অসম্পূর্ণ। কিন্তু পর্ণালী জানিয়েছেন, তিনি বইটি শেষ করবেনই। কারণ তাঁর কথায়, “যে মানুষটা সত্যি বলতে ভয় পেতেন না, তাঁকে স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখাটা জরুরি।”
বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে অনীক দত্ত হয়তো একজন ব্যতিক্রমী পরিচালক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিতে তিনি রয়ে গেলেন এক নির্ভীক, রসিক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং গভীরভাবে মানবিক মানুষ হিসেবে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.