গঙ্গার ভাঙনে কার্যত বিপর্যস্ত মালদহের মানিকচকের ভূতনি চর। সর্বস্ব নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আগেই বাড়ির ইট, কাঠের দরজা-জানলা খুলে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছেন বহু পরিবার। গ্রামজুড়ে এখন শুধু বাড়ি ভাঙার ব্যস্ততা আর স্বজন হারানোর আশঙ্কা। কোথাও কোমরসমান জল, কোথাও আবার তীব্র স্রোতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বানভাসি মানুষের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ভূতনির পরিবেশ।
সম্প্রতি মুলিরাম টোলার একটি বড় বাড়ি চোখের সামনে গঙ্গার গর্ভে তলিয়ে যায়। সেই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাড়ির মালিক নিবারণ মণ্ডল। কোমরসমান জলে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরকে ডাকলেও শেষরক্ষা হয়নি। একের পর এক বাড়ি নদীতে চলে যাওয়ার আতঙ্কে দিশেহারা এলাকার বাসিন্দারা। গঙ্গা, ফুলহার এবং কোশি—তিন নদী ঘেরা ভূতনি চর। রাজ্যের গঙ্গার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই চরে গত কয়েক বছরে কোশি নদীতে তেমন ভাঙন দেখা যায়নি। কিন্তু চলতি বছরে পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোশির ভাঙনও শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। ইতিমধ্যেই সাতটি গ্রাম ধীরে ধীরে নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভাঙনের হাত থেকে বাড়ির কিছুটা হলেও সম্পদ বাঁচাতে বাসিন্দারা ইট, কাঠের দরজা-জানলা খুলে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে বাড়ি ভাঙার জন্য শ্রমিকও মিলছে না। কারণ এলাকার প্রায় প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে বন্যা ও ভাঙনের কবলে পড়েছেন।
শুধু ভূতনি নয়, মালদহের কালিয়াচক-৩ নম্বর ব্লকের ছয়টি অঞ্চলের প্রায় ২০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। পারদেওনাপুর-শোভাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। জলমগ্ন রাস্তায় তৈরি হয়েছে তীব্র স্রোত। প্রায় ২০ দিন ধরে বহু এলাকা জলবন্দি। যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নৌকা ও টিনের ডোঙ্গাই এখন ভরসা। নৌকা না পেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডোঙ্গায় পারাপার করছেন বাসিন্দারা। রবিবার নৌকায় করে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যান রাজ্যের সেচ দপ্তর ও আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জুয়েল মুর্মু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বৈষ্ণবনগরের বিধায়ক রাজু কর্মকার, বিজেপির দক্ষিণ মালদহ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়, কালিয়াচক-৩-এর বিডিও, বৈষ্ণবনগর থানার আইসি এবং সেচ দপ্তরের আধিকারিকরা।

মন্ত্রী জুয়েল মুর্মু বলেন, এলাকা সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারি নৌকা এবং বানভাসিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একই দিনে নৌকায় ভূতনি এলাকা পরিদর্শন করেন দক্ষিণ মালদহের কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরীও। দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজও চলছে জোরকদমে। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা এবং অসুস্থদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে কাজ করছে সিভিল ডিফেন্স। ত্রাণ পৌঁছনোর কাজ আরও দ্রুত ও সুশৃঙ্খল করতে মানিকচকের ভূতনি এলাকায় উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে জোনাল রিলিফ অফিস চালু করেছে মালদহ জেলা প্রশাসন।

প্রশাসনের তরফে বুথ ও বসতি-ক্লাস্টারভিত্তিক ত্রাণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। শুকনো খাবার, ওষুধ, পশুখাদ্য, নৌকা, জেনারেটর-সহ বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী স্থানীয় স্তরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দুর্গত মানুষকে ত্রাণ বা চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হবে না। মালদহের জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপূর জানিয়েছেন, প্রশাসনের সমস্ত আধিকারিক প্লাবিত এলাকায় কাজ করছেন। দুর্গত মানুষের পাশে প্রশাসন রয়েছে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
মালদহের ভূতনিতে বন্যার জলে ডুবে মৃত্যু ৪ বছরের শিশুর, এখনও জলমগ্ন ৫৯ গ্রাম
এদিকে ভূতনি চরকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে এবার বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রশাসন সূত্রে খবর, আইআইটি কানপুরের বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ভাঙন সমস্যা নিয়ে সেচ দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইআইটি কানপুরের প্রতিনিধিরা। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁদের একটি দল মালদহে যেতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
নদীর ভাঙন ও বন্যার জোড়া বিপর্যয়ে ভূতনির মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কোথায় হবে তাঁদের পরবর্তী ঠিকানা? নদী যদি এভাবেই গ্রাস করতে থাকে, তবে বসতবাড়ি, জমি-জায়গা থেকে শুরু করে বহু বছরের স্মৃতি—সবই যে জলের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.