চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, প্রায় অবিশ্বাস্য। মায়ের গর্ভে নয়, বরং জরায়ুর বাইরের একটি টিউমারের ভিতর বেড়ে ওঠা ভ্রূণ—আর সেই ভ্রূণ থেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ একটি শিশুর জন্ম! এই অসম্ভবকেই বাস্তবে রূপ দিল ক্যালিফোর্নিয়ার চার মাসের শিশু রিউ লোপেজ়।
রিউয়ের মা সুজ়ে লোপেজ় পেশায় একজন নার্স। বয়স ৪১। বহু বছর ধরেই তিনি জরায়ুর নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। একাধিক সিস্টের সমস্যার কারণে আগেই অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয়েছে তাঁর ডানদিকের ডিম্বাশয়। অতীতে একাধিকবার সিস্ট অপারেশন হওয়ায় শারীরিক পরিবর্তন তাঁর কাছে নতুন কিছু ছিল না। তাই চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে যখন আবার পেটের আকার কিছুটা বাড়তে শুরু করে, তখন সেটিকেও তিনি সিস্টের স্বাভাবিক উপসর্গ বলেই ধরে নেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—সুজ়ে জানতেনই না যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভাবস্থার সাধারণ কোনও লক্ষণই তাঁর শরীরে ধরা পড়েনি। না ছিল বমি ভাব, না ছিল গর্ভধারণের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। কয়েক মাসে তাঁর ওজন বেড়ে যায় প্রায় ১০ কেজি। অবশেষে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেই নড়েচড়ে বসেন চিকিৎসকেরাও।
পরীক্ষা করে জানা যায়, সুজ়ে আদতে ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু ভ্রূণটি জরায়ুতে নয়—লিভারের কাছাকাছি একটি অ্যামনিওটিক থলিতে বেড়ে উঠছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি’ বা জরায়ুর বাইরের গর্ভাবস্থা। সাধারণত এ ধরনের গর্ভাবস্থা ফ্যালোপিয়ান টিউবে হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভ্রূণকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করতে হয়। না হলে মারাত্মক রক্তক্ষরণ甚至 মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ৩০ হাজার গর্ভাবস্থার মধ্যে মাত্র একটিতে এমন ঘটনা দেখা যায়। আর সেই গর্ভাবস্থা পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত পৌঁছনোর সম্ভাবনা আরও কম—প্রায় ১০ লক্ষে একবার। তাও যদি কোনও ভাবে শিশু জন্মায়, তবে জন্মগত ত্রুটি থাকার আশঙ্কা থাকে অত্যন্ত বেশি।
এই ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছিল লোপেজ় দম্পতির। রিউয়ের বাবা অ্যান্ড্রু লোপেজ় বলেন, “বাইরে শান্ত থাকার চেষ্টা করলেও ভিতরে ভিতরে প্রতিটি মুহূর্তে ভয় কাজ করছিল। জানতাম, যে কোনও সময় স্ত্রী বা সন্তানকে হারাতে পারি।”
সব আশঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করে ১৮ অগস্ট জন্ম নেয় রিউ। ওজন ৩.৬ কেজি। আশ্চর্যজনক ভাবে, কোনও রকম শারীরিক ত্রুটি ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীর আলো দেখে সে। সফল অস্ত্রোপচারের পর সুজ়েও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সেডার্স-সিনাই হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডা. জন ওজ়িমেক জানান, “এই ধরনের ঘটনা এতটাই বিরল যে আমরা এই কেসটি নিয়ে একটি মেডিক্যাল জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করছি।”
আজ রিউ চার মাসের এক হাসিখুশি শিশু। তার সময় কাটে ১৮ বছর বয়সি দিদি কাইলার সঙ্গে খেলাধুলায়। ছেলের দিকে তাকিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে সুজ়ে বলেন, “আমি অলৌকিকে বিশ্বাস করি। ঈশ্বরই আমাদের এই উপহার দিয়েছেন। আমাদের পরিবার যেন আজ সম্পূর্ণ হল।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন বাস্তবের মাঝে রিউয়ের জন্ম তাই শুধু একটি মেডিক্যাল মিরাকল নয়—এ এক মানবিক আশার গল্প, যা অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.