হিন্দু পুরাণে শনি দেবতাকে কর্মফলদাতা হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের ভালো-মন্দ কর্মের বিচার করে যথাযথ ফল প্রদানই তাঁর প্রধান দায়িত্ব। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, শনির বক্রদৃষ্টি যার উপর পড়ে, তার জীবনে নেমে আসে দুঃখ, কষ্ট ও বাধা। বলা হয়, শনির রোষ থেকে কেউই নিস্তার পায় না—এমনকি দেবাদিদেব মহাদেবও নাকি তাঁর তির্যক দৃষ্টির প্রভাব থেকে রেহাই পাননি। এই বিশ্বাসকে ঘিরেই পুরাণে রয়েছে এক আশ্চর্যজনক কাহিনি।
পুরাণ অনুসারে, শনি নিজে মহাদেবকে নিজের গুরু হিসেবে মান্য করতেন। শিবের আশীর্বাদেই শনি কর্মফলদাতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। কে কোন কর্মের জন্য কী ফল পাবে—এই বিচার করার অধিকার শনি পান স্বয়ং মহাদেবের কৃপায়। তাই শনি কেবল শাস্তিদাতা নন, বরং সৎ কর্মের জন্য শুভ ফলদাতাও। কারও জীবনে শনির দশা মানেই যে অমঙ্গল, তা নয়—ভালো কর্মের ফলে শনির প্রভাবে সৌভাগ্যও লাভ হতে পারে।
পুরাণে আরও বলা হয়, শৈশবকাল থেকেই শনি ছিলেন অত্যন্ত রাগী ও উদ্ধত স্বভাবের। তাঁর এই স্বভাব বদলাতে পিতা সূর্যদেব তাঁকে মহাদেবের শরণাপন্ন করেন। শিব বহু চেষ্টা করেও শনির ক্রোধ শান্ত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আক্রমণ করেন। সেই আঘাতে শনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে শিব তাঁকে পুনরায় জ্ঞান ফিরিয়ে দিলে শনি মহাদেবের পরম ভক্ত হয়ে ওঠেন এবং তাঁকেই নিজের গুরু রূপে স্বীকার করেন।
এই সম্পর্কের মধ্যেই ঘটে যায় সেই বিখ্যাত ঘটনা। একদিন শনি মহাদেবকে জানান, নির্দিষ্ট এক দিনে তিন ঘণ্টার জন্য তাঁর উপর শনির বক্রদৃষ্টি পড়বে। শনির এই দৃষ্টি এড়ানোর জন্য মহাদেব পরের দিন ভোরে কৈলাশ ত্যাগ করে মর্ত্যে নেমে আসেন এবং একটি হাতির রূপ ধারণ করে সারাদিন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান। দিন শেষে তিনি ভাবলেন, দেবরূপ ত্যাগ করে পশুর রূপ নেওয়ায় হয়তো শনির দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু কৈলাশে ফিরে এসে তিনি দেখেন, শনি সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। মহাদেব তখন গর্বের সঙ্গে বলেন, সকলের ধারণা ভুল প্রমাণ করে তিনি শনির বক্রদৃষ্টি এড়াতে পেরেছেন। উত্তরে শনি হাসতে হাসতে জানান, মহাদেব মোটেও তাঁর দৃষ্টি এড়াতে পারেননি। শিব বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলে শনি বলেন—দেবরূপ ত্যাগ করে পশুর রূপ নিয়ে মর্ত্যে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তাঁর বক্রদৃষ্টির প্রকৃত ফল।
এই উত্তরে প্রসন্ন হয়ে মহাদেব শনিকে চূড়ান্তভাবে কর্মফলদাতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই থেকেই বিশ্বাস করা হয়, কেউ অন্যায় করলে শনির বক্রদৃষ্টি সাড়ে সাতি ও ধাইয়ার মাধ্যমে তাকে শাস্তি দেয়, আর সৎ কর্ম করলে শনি দেন ন্যায্য ও শুভ ফল। এই পুরাণকথা আজও মানুষের মনে শনির শক্তি ও কর্মফলের অমোঘ নিয়মের প্রতি গভীর বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।