সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা শুধু মানসিক বা পারিবারিক প্রস্তুতির বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভবিষ্যৎ মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্যের প্রশ্নও। বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভধারণের আগে শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে অনেক জটিলতা আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে জিনগত রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়, প্রি-প্রেগন্যান্সি বা গর্ভধারণ-পূর্ব স্ক্রিনিংয়ের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)।
বিশেষ করে পরিবারে বংশগত রোগের ইতিহাস থাকলে, দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে অথবা আগে গর্ভধারণজনিত সমস্যা হয়ে থাকলে এই পরীক্ষাগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কেন গর্ভধারণের আগে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন?

গর্ভধারণের আগে শরীরের বিভিন্ন অসুখ বা পুষ্টির ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এতে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি, প্রসবকালীন জটিলতা এবং মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
হরমোন ও ডায়াবিটিস পরীক্ষা
থাইরয়েড পরীক্ষা:
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে এবং গর্ভপাতের আশঙ্কাও বাড়তে পারে। তাই টি৩, টি৪ এবং টিএসএইচ পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের অবস্থা জানা প্রয়োজন।
রক্তে শর্করার পরীক্ষা:
গর্ভধারণের আগে এইচবিএ১সি ও ফাস্টিং ব্লাড সুগার পরীক্ষা করলে ডায়াবিটিস বা ভবিষ্যতে গর্ভকালীন ডায়াবিটিসের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অনিয়ন্ত্রিত রক্তে শর্করা ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
রক্তের সাধারণ ও বংশগত রোগের স্ক্রিনিং
থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা:
স্বামী-স্ত্রী দু’জনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে সন্তানের গুরুতর থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই গর্ভধারণের আগেই এই স্ক্রিনিং করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিবিসি ও রক্তের গ্রুপ:
সিবিসি পরীক্ষায় রক্তাল্পতা বা অন্যান্য রক্তজনিত সমস্যা ধরা পড়ে। পাশাপাশি রক্তের গ্রুপ জানা থাকলে আরএইচ (Rh) ফ্যাক্টর-সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সংক্রামক রোগের পরীক্ষা
গর্ভধারণের আগে সংক্রমণ রয়েছে কি না, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
*টর্চ (TORCH) প্যানেল পরীক্ষার মাধ্যমে রুবেলা, সিফিলিস, হার্পিস, সাইটোমেগালোভাইরাস, ভ্যারিসেলা-জস্টারসহ একাধিক সংক্রমণ শনাক্ত করা যায়।
*এইচআইভি ও হেপাটাইটিস বি এবং সি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে চিকিৎসা শুরু করা যায়, যা মা থেকে সন্তানের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রজনন স্বাস্থ্য পরীক্ষা
পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড:
জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের গঠন, সিস্ট, ফাইব্রয়েড বা পলিসিস্টিক ওভারি (পিসিওএস/পিসিওডি)-এর মতো সমস্যা রয়েছে কি না, তা জানতে এই পরীক্ষা করা হয়।
ভিটামিন ডি ও ভিটামিন বি১২:
এই দুই ভিটামিনের ঘাটতি গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট শুরু করা হয়।
জেনেটিক স্ক্রিনিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পরিবারে জিনগত রোগের ইতিহাস থাকলে বা বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দিতে পারেন।
এনআইপিটি (NIPT):
এটি মূলত গর্ভধারণের পরে করা একটি রক্তপরীক্ষা, যার মাধ্যমে ডাউন সিন্ড্রোমসহ কিছু ক্রোমোজোমজনিত সমস্যার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বয়স বেশি হলে চিকিৎসকেরা এই পরীক্ষার কথা বিবেচনা করতে পারেন।
প্রিইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং (PGT):
সাধারণত আইভিএফ (IVF)-এর ক্ষেত্রে ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের আগে ক্রোমোজোম বা নির্দিষ্ট জিনগত ত্রুটি শনাক্ত করতে এই পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। সব গর্ভধারণে এটি প্রয়োজন হয় না; নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ থাকলেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শে করা হয়।
শেষ কথা
গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো মানে অকারণ আতঙ্ক নয়, বরং সুস্থ মাতৃত্বের জন্য সচেতন প্রস্তুতি। থাইরয়েড, ডায়াবিটিস, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, সংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং, প্রজনন স্বাস্থ্য মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জেনেটিক পরীক্ষা— সব মিলিয়ে একটি পরিকল্পিত মূল্যায়ন মা ও শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোন পরীক্ষা আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন, তা অবশ্যই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.