ভারতের বারোটি পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম মল্লিকার্জুন মন্দির শুধুমাত্র ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেই নয়, তার অনন্য অবস্থানের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমে অবস্থিত এই প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র এমন এক জঙ্গলের মধ্যে গড়ে উঠেছে, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাঘ্র সংরক্ষণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত। ফলে এখানে পৌঁছানোর পথ যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই দর্শন মেলে প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনের।
নাল্লামালা পাহাড়কে ঘিরে বিস্তৃত নাগার্জুনসাগর-শ্রীশৈলম ব্যাঘ্র প্রকল্প ভারতের বৃহত্তম টাইগার রিজার্ভগুলির মধ্যে অন্যতম। কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই অরণ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও চিতাবাঘ, সম্বর হরিণ, বুনো কুকুর এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখির বাস। সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যেই শতাব্দীপ্রাচীন মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির আজও লক্ষ লক্ষ ভক্তের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।
এই মন্দির ভগবান শিবের মল্লিকার্জুন রূপ এবং দেবী ভ্রমরাম্বাকে উৎসর্গ করে নির্মিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানে একই সঙ্গে জ্যোতির্লিঙ্গ ও শক্তিপীঠের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে শৈব ও শক্ত— দুই ধারার ভক্তদের কাছেই এই স্থান অত্যন্ত পবিত্র।

পুরাণে বর্ণিত আছে, পারিবারিক এক ঘটনার পর পুত্র কার্তিকেয়কে সান্ত্বনা দিতে ভগবান শিব ও দেবী পার্বতী এই অঞ্চলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই স্মৃতিতেই মল্লিকার্জুন তীর্থের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। বহু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শ্রীশৈলমকে মুক্তি বা মোক্ষলাভের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থাপত্যের দিক থেকেও মন্দিরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রাবিড় শিল্পরীতিতে নির্মিত বিশাল গোপুরাম, সূক্ষ্ম অলঙ্করণে সজ্জিত স্তম্ভ ও মণ্ডপ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে মহাশিবরাত্রি এবং ব্রহ্মোৎসবের সময় মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের ঢল নামে। তখন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসবের আবহে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
শ্রীশৈলম ভ্রমণের আদর্শ সময় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। এই সময়ে আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল ও মনোরম থাকে, ফলে জঙ্গলপথে যাত্রাও আরামদায়ক হয়। হায়দরাবাদ থেকে সড়কপথে সহজেই পৌঁছানো যায় এখানে। নিকটতম রেলস্টেশন মারকাপুর রোড, সেখান থেকেও সড়কপথে মন্দিরে যাওয়া যায়। এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানার বিভিন্ন শহর থেকে নিয়মিত বাস পরিষেবা উপলব্ধ।
মন্দির দর্শনের পাশাপাশি পর্যটকেরা ঘুরে দেখতে পারেন শ্রীশৈলম বাঁধ, আক্কামহাদেবী গুহা, সাক্ষী গণপতি মন্দির এবং শিখরেশ্বরম ভিউ পয়েন্টের মতো জনপ্রিয় স্থান। পাহাড়, অরণ্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এই অনন্য সমন্বয় শ্রীশৈলমকে শুধু তীর্থস্থান নয়, এক বিশেষ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছে।
ঘন জঙ্গলের নীরবতার মধ্যে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, পাহাড়ি প্রকৃতির আবহ এবং শতাব্দীপ্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য— সব মিলিয়ে মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ এমন এক অভিজ্ঞতা দেয়, যা ভ্রমণপ্রেমী ও ভক্ত উভয়ের মনেই দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকে।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.