বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ট্রাম্পের শুল্ক হুঁশিয়ারি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বারবার পড়েছে ভারতীয় শেয়ার বাজারে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে চাপে পড়েছিল বাজার। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং বিদেশি মূলধন টানতে বড় সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় সরকার। Union Budget 2026-এ রবিবার সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ভারতীয় শেয়ার বাজারকে কার্যত বিদেশিদের জন্য আরও ‘উন্মুক্ত’ করে দেওয়ার ঘোষণা করলেন।
বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী জানান, শেয়ার বাজার এবং কর্পোরেট ঋণ বাজারকে শক্তিশালী করতে মোট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, কর্পোরেট বন্ডের জন্য শক্তিশালী বাজার নির্মাণ-কাঠামো তৈরি করা হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন আরও সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, বিদেশি ব্যক্তিদের ভারতীয় শেয়ার বাজারে সরাসরি বিনিয়োগের পথ খুলে দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত সংস্থায় বিদেশিদের অংশীদারিত্ব গ্রহণের সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, ভারতের বাইরে বসবাসকারী ব্যক্তিরা (Non-Residents) এবার Portfolio Investment Scheme (PIS)-এর মাধ্যমে সরাসরি ইক্যুইটি শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতদিন এই পথে বিনিয়োগ ছিল জটিল ও সীমাবদ্ধ। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে সীমা ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, সম্মিলিত বিদেশি অংশীদারিত্বের সীমা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় সংস্থাগুলিতে আরও বড় অংশীদার হতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং যেভাবে ভারতের বাজার বিশ্বের কাছে খুলে দিয়েছিলেন, তার সঙ্গেই তুলনা টানা হচ্ছে এই ঘোষণার। সেই সময় লাইসেন্স রাজের অবসান ঘটিয়ে বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে দিয়েছিল ভারত। যার ফলস্বরূপ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আসে। বাজেট ২০২৬-এর এই ঘোষণাকেও অনেকেই সেই ঐতিহাসিক সংস্কারের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন।
এতদিন বিদেশিরা কি ভারতীয় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতেন না? করতেন অবশ্যই, তবে সেই প্রক্রিয়া ছিল অনেকটাই জটিল। মূলত FPI (Foreign Portfolio Investor) বা NRI রুট ব্যবহার করে বিনিয়োগ করতে হতো, যেখানে নিয়মকানুন ও সীমাবদ্ধতা ছিল বেশি। নতুন ব্যবস্থায় সেই জটিলতা অনেকটাই কমবে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতীয় বাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সব মিলিয়ে, বাজেট ২০২৬-এর এই ঘোষণা ভারতীয় শেয়ার বাজারে নতুন প্রাণ ফেরাতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে। বিদেশি মূলধনের প্রবাহ বাড়লে বাজারে তারল্য বাড়বে, সংস্থাগুলির মূলধন সংগ্রহ সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিও লাভবান হবে—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।