গত কিছুদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সোনা ও রুপোর দাম। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার প্রভাব আগে এই দুই মূল্যবান ধাতুর বাজারে পড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারীর মনে প্রশ্ন—এই সময় কি বিনিয়োগের জন্য ভালো? আর করলে সোনা নাকি রুপো—কোনটি বেশি লাভজনক হতে পারে?
সপ্তাহ শেষে বাজারে সোনা-রুপোর দাম

সপ্তাহের শেষে বাজারদর অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে,
১ গ্রাম বিশুদ্ধ সোনার দাম প্রায় ১৪,৫৭৮ টাকা।
২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি গ্রাম প্রায় ১৩,৮৫০ টাকা।
১৮ ক্যারেট সোনা কিনতে গেলে প্রতি গ্রামে খরচ প্রায় ১১,৩৭০ টাকা।
অন্যদিকে, রুপোর দাম প্রতি কেজি প্রায় ২,৩১,৯০২ টাকা।
শুক্রবারের তুলনায় এই দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগের দিনে সোনার দাম ছিল কিছুটা কম এবং রুপোর দামও নিচের দিকে ছিল। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে স্পষ্ট ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত এক সপ্তাহে সোনার দাম প্রায় ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন কমেছিল সোনা ও রুপোর দাম?

বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতুর দাম কমার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করেছিল।
১. সুদের হার বাড়ার প্রভাব
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ার কারণে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর বদলে একই অবস্থায় রেখেছে। বিশেষ করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখায় ডলারের শক্তি বেড়েছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা কেনাবেচা মূলত ডলারে হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে সোনার চাহিদা কিছুটা কমে যায়। ফলে দামও নিচে নেমেছিল।
২. শিল্পক্ষেত্রে রুপোর চাহিদা কমে যাওয়া
রুপোর ব্যবহার শুধু অলংকারেই সীমাবদ্ধ নয়। সোলার প্যানেল, ইলেকট্রনিক্স এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে রুপোর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ রুপোর চাহিদা আসে শিল্পখাত থেকে। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শিল্পের গতি কমে যাওয়ায় রুপোর চাহিদাও কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে দামে।
৩. স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া
দাম বাড়তে শুরু করতেই অনেক স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারী সোনা ও রুপোয় বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু বাজারে সামান্য স্থিরতা আসতেই তারা দ্রুত লাভ তুলে বাজার থেকে বেরিয়ে যান। ফলে একসঙ্গে বিক্রি বেড়ে গিয়ে দাম কমে যায়।
এখন বাজারের অবস্থা কী?
বর্তমানে পরিস্থিতি আগের তুলনায় স্থিতিশীল হলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনও চলছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। তবু বাজারে সোনা ও রুপোর দামের গ্রাফ আবার উপরের দিকে উঠছে, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুপাত

বাজার বিশ্লেষকরা সোনা ও রুপোর তুলনামূলক মূল্য বোঝার জন্য একটি বিশেষ অনুপাত ব্যবহার করেন। এতে ১০ গ্রাম সোনার দামকে সমমূল্যের রুপোর দামের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় একই মূল্যের সোনা কিনতে কত ইউনিট রুপো প্রয়োজন।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এই অনুপাত প্রায় ৬০-এর কাছাকাছি। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার দামের সমান হতে প্রায় ৬০ ইউনিট রুপো প্রয়োজন।
এই অনুপাত কী বোঝায়?
যদি অনুপাত ৮০-এর বেশি হয়, সাধারণত বোঝায় রুপোর দাম তুলনামূলক কম। তখন রুপোতে বিনিয়োগ লাভজনক হতে পারে।
আবার অনুপাত ৫০-এর নিচে নেমে গেলে বোঝায় রুপোর দাম অনেক বেড়েছে এবং সোনা তুলনামূলক সস্তা।
কোভিড সময় এই অনুপাত একসময় ১০০-এরও বেশি হয়েছিল, এমনকি ১২৫ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আবার ২০২৬ সালের শুরুতে রুপোর দাম দ্রুত বাড়ায় এই অনুপাত ৪৫-এর নিচে নেমে গিয়েছিল।
আগামী কয়েক মাসে কী হতে পারে?
বাজার বিশেষজ্ঞদের অনুমান, আগামী তিন মাসে এই অনুপাত ৭০–৭৫-এর মধ্যে পৌঁছতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে সোনার দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং রুপোর দামেও কিছুটা ওঠানামা দেখা যেতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য কী কৌশল হতে পারে?

এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক বলছেন—একটি ধাতুর উপর পুরো বিনিয়োগ না করে সোনা ও রুপো দুটিতেই কিছুটা করে বিনিয়োগ করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ কৌশল হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অনেকেই সোনাকে বেছে নেন।
অন্যদিকে, শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা বাড়লে রুপোর দাম দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তাই বাজারের অনুপাত, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং নিজের বিনিয়োগের লক্ষ্য—সব কিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.