গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়লেই অনেকের মাইগ্রেনের সমস্যা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মাথার একপাশে অসহ্য যন্ত্রণা, বমি ভাব, চোখে ঝাপসা দেখা, অম্বল কিংবা আলো-শব্দে অস্বস্তি— এই সব উপসর্গ গরমকালে অনেক বেশি প্রকট হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত তাপ, শরীরে জলের ঘাটতি, অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় রোদে থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মাইগ্রেনের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে যন্ত্রণার তীব্রতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
কেন গরমে বাড়ে মাইগ্রেন?
অতিরিক্ত গরমে শরীর দ্রুত ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়। এর ফলে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে প্রভাব পড়ে এবং মাথা ব্যথার প্রবণতা বাড়ে। পাশাপাশি ঘাম বেশি হওয়ায় শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজও কমে যেতে পারে। অনিয়মিত খাওয়া, কম ঘুম এবং অতিরিক্ত ক্লান্তিও মাইগ্রেন অ্যাটাক ডেকে আনতে পারে।

মাইগ্রেন কমাতে কোন নিয়মগুলি মানবেন?
১. পর্যাপ্ত জল পান করুন
গরমে শরীরে জলের অভাব হলেই মাথা ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু তেষ্টা পেলেই নয়, দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে জল খাওয়ার অভ্যাস জরুরি। সাধারণ ভাবে দিনে প্রায় ৩ লিটার জল পান উপকারী হতে পারে। তবে কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই ভাল।
২. দীর্ঘ ক্ষণ খালি পেটে থাকবেন না
অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে মাইগ্রেন শুরু হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া জরুরি। সকালের খাবার দেরি না করে খেয়ে নেওয়া এবং রাতের খাবারও খুব দেরি না করাই ভাল।
৩. প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার রাখুন
ডিম, মাছ, দুধ, পনির, ডাল, ছোলা, টোফু, আমন্ড কিংবা গ্রিক ইয়োগার্টের মতো খাবার শরীরকে দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। এতে হঠাৎ দুর্বলতা বা সুগারের ওঠানামা কম হয়, যা মাইগ্রেনের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি
কম ঘুম বা অনিয়মিত ঘুম মাইগ্রেনের অন্যতম বড় কারণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।
৫. কুমড়োর বীজ খেতে পারেন
কুমড়োর বীজে ম্যাগনেশিয়াম থাকে, যা স্নায়ুর কার্যকারিতায় সাহায্য করে। নিয়মিত অল্প পরিমাণে কুমড়োর বীজ খেলে মাথা ব্যথার সমস্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।
৬. বেশি করে শাকসব্জি খান
ফাইবার সমৃদ্ধ শাকসব্জি হজম ভালো রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি শরীরকে ঠান্ডা রাখতেও উপকারী। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ সব্জি খাওয়ার অভ্যাস স্বাস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে।
৭. ফলের রস নয়, গোটা ফল খান
গোটা ফলে ফাইবার বেশি থাকে, যা শরীরের জন্য বেশি উপকারী। ফলে থাকা প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণও সম্পূর্ণ ভাবে পাওয়া যায়।
৮. অতিরিক্ত ক্যাফিন এড়িয়ে চলুন
অতিরিক্ত চা, কফি বা সফ্ট ড্রিঙ্ক অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেন বাড়াতে পারে। আবার হঠাৎ সম্পূর্ণ বন্ধ করলেও মাথা ব্যথা হতে পারে। তাই পরিমিত মাত্রায় ক্যাফিন গ্রহণ করাই ভাল।
৯. অতিরিক্ত চিনি কমান
চকোলেট, মিষ্টি বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস জরুরি।
১০. জাঙ্ক ফুড থেকে দূরে থাকুন
প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেলে ভাজা স্ন্যাক্স এবং ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। এতে মাইগ্রেনের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
১১. রোদে কম বেরোন
দুপুরের কড়া রোদ মাথা ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বাইরে বেরোলে ছাতা, সানগ্লাস বা টুপি ব্যবহার করা ভাল।
১২. স্ক্রিনটাইম কমান
দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে অনেকের মাইগ্রেন ট্রিগার হতে পারে। মাঝেমধ্যে চোখকে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি।
১৩. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন
অতিরিক্ত উদ্বেগ ও মানসিক চাপও মাইগ্রেনের বড় কারণ। তাই নিয়মিত ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা হালকা যোগাসন মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি মাথা ব্যথা খুব ঘন ঘন হয়, দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, অথবা বমি, চোখে ঝাপসা দেখা কিংবা অসাড়তার মতো সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার বদলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানোই নিরাপদ।