বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকা লিয়োনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে ঘিরেই আবারও বিশ্বকাপের উন্মাদনা। বয়সের ভার, কমে আসা গতি কিংবা আগের মতো একক দক্ষতায় ম্যাচের রং বদলে দেওয়ার ক্ষমতা কিছুটা ক্ষয় হলেও জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের বিচারে এখনও তাঁরাই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তাঁদের কেরিয়ারের এক বিশেষ অধ্যায়, কারণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুই ফুটবলারই ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিতে চলেছেন।
তবে একই মঞ্চে নামলেও লক্ষ্য আলাদা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মেসির সামনে সুযোগ রয়েছে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের। অন্যদিকে রোনাল্ডোর লক্ষ্য পর্তুগালকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ এনে দেওয়া এবং দীর্ঘদিনের ‘গোট’ বা সর্বকালের সেরা ফুটবলার বিতর্কে নিজের দাবিকে আরও শক্তিশালী করা।
মেসির সামনে নতুন ইতিহাস
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে কিশোর প্রতিভা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন মেসি। সেই সময় আর্জেন্টিনা দলে তাঁর ভূমিকা সীমিত হলেও প্রতিভার ঝলক স্পষ্ট ছিল। এরপর পাঁচটি বিশ্বকাপ জুড়ে তিনি ধীরে ধীরে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন।
২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেও শিরোপা ছুঁতে পারেননি তিনি। জার্মানির কাছে পরাজয়ের হতাশা তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে। ২০১৮ সালেও বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছিল প্রত্যাশার আগেই। তবে ২০২২ সালে কাতারে স্বপ্নপূরণ হয়। বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। সেই সাফল্যের পর দেশের ফুটবল ইতিহাসে দিয়েগো মারাদোনার পাশে তাঁর নাম উচ্চারিত হতে শুরু করে।
বিশ্বকাপ জয়ের পরও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর সাফল্যের ধারা থামেনি। কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতেছেন। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং আরও একবার ট্রফি জয়ের মাধ্যমে নিজের উত্তরাধিকারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
পরিসংখ্যানও মেসির পক্ষে কথা বলছে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড ইতিমধ্যেই তাঁর দখলে। গোলসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। আসন্ন আসরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ভাঙার সুযোগ রয়েছে তাঁর সামনে। তাছাড়া জাতীয় দলের হয়ে ২০০ ম্যাচের মাইলফলকও স্পর্শ করতে চলেছেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া মেসি এখনও আর্জেন্টিনা দলের কেন্দ্রবিন্দু। কোচ লিয়োনেল স্কালোনি তাঁকে ঘিরেই কৌশল সাজাচ্ছেন। তাই অনেকের মতে, এটিই হতে পারে বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ উপস্থিতি এবং সেই অধ্যায় স্মরণীয় করতেই নামবেন তিনি।
রোনাল্ডোর শেষ বড় স্বপ্ন
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারও প্রায় দুই দশকের বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত। ২০০৬ সাল থেকে টানা বিশ্বকাপ খেললেও এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁর নাগালের বাইরে। পর্তুগালের হয়ে ইউরো জয়ের সাফল্য থাকলেও বিশ্বকাপ না জেতার আক্ষেপ রয়ে গেছে।
বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান উজ্জ্বল হলেও নকআউট পর্বে তাঁর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পর্তুগাল কয়েকবার সম্ভাবনা জাগালেও শিরোপার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি। এবারও তুলনামূলক সহজ গ্রুপে থাকায় নকআউটে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী সমর্থকেরা। কিন্তু আসল পরীক্ষা হবে পরের ধাপগুলোতে।
জাতীয় দলের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ড ইতিমধ্যেই রোনাল্ডোর দখলে। বয়স ৪১-এর কাছাকাছি হলেও তাঁর ফিটনেস এবং প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা এখনও প্রশংসিত। রবার্তো মার্তিনেজের দলেও তিনি অধিনায়ক এবং অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস।
‘গোট’ বিতর্কের শেষ অধ্যায়?
মেসি ও রোনাল্ডোর তুলনা গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য ট্রফি, গোল এবং ব্যক্তিগত সম্মাননায় দু’জনই প্রায় সমান তালে এগিয়েছেন। তবে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর বিতর্কের পাল্লা অনেকের চোখে মেসির দিকে ঝুঁকেছে।
বিশ্বকাপ ট্রফি ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ট্রফি মেসির সংগ্রহে থাকলেও রোনাল্ডোর নেই। ফলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তাঁর কাছে শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; বরং নিজের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণের শেষ সুযোগ।
বিশ্বকাপের শেষ মহারণ
ফুটবল ইতিহাসে মেসি ও রোনাল্ডোর মতো দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করা দুই তারকা খুব কমই দেখা গেছে। তাঁদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিজেই এক ঐতিহাসিক ঘটনা। একজন নামছেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপের সন্ধানে, অন্যজন প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে।
ফল যাই হোক, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সম্ভবত ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিদায়ের মঞ্চ হতে চলেছে। কারণ এই আসরের পর হয়তো আর কখনও বিশ্বকাপের আলোয় একসঙ্গে দেখা যাবে না লিয়োনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। আর সেই কারণেই এই বিশ্বকাপকে অনেকেই বলছেন—‘দ্য লাস্ট ডান্স’।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.