আরজি কর (R G Kar) হাসপাতালে চিকিৎসক-ছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মৃতদেহ দ্রুত সৎকার করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হল পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে। বৃহস্পতিবার সকালে ওড়িশার পুরী লাগোয়া একটি হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নতুন করে দায়ের হওয়া এফআইআরের ভিত্তিতেই এই গ্রেফতারি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর বাবা সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ থানায় নতুন করে অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে নির্মল ঘোষ, পানিহাটির তৎকালীন পুরপ্রতিনিধি সোমনাথ দে এবং প্রতিবেশী সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মেয়ের দেহ দ্রুত সৎকারের জন্য রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়।
পুলিশের দাবি, এফআইআর দায়ের হওয়ার পরেই ওড়িশায় চলে যান নির্মল। পুলিশের নজর এড়াতে পুরনো ফোন বন্ধ রেখে নতুন ফোন ও সিম ব্যবহার করছিলেন তিনি। সেই ফোন থেকেই ঘনিষ্ঠ কয়েক জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। মঙ্গলবার মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন থেকে তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে জানতে পারে পুলিশ। সেই সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ৯টা নাগাদ পুরী সংলগ্ন একটি হোটেলে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেই নির্মলকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, গ্রেফতারের পর নির্মল ঘোষকে বৃহস্পতিবার ওড়িশার আদালতে হাজির করানো হবে। সেখান থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে তাঁকে কলকাতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। শুক্রবার তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে হাজির করানো হতে পারে।নির্মলের গ্রেফতারি নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে এত দিন তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন কী ভাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী।
কী অভিযোগ উঠেছে নির্মলদের বিরুদ্ধে?
অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট ময়নাতদন্তের পর নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হলেও দ্রুত সৎকারের জন্য পরিবারের উপর চাপ তৈরি করা হয়েছিল। মৃতার পরিবারের দাবি, নির্মল ঘোষ-সহ কয়েক জন দলীয় কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দ্রুত দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। পরিবারের আরও অভিযোগ, শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আত্মীয়দের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। ঘোলা থানার নাটাগড় কদমতলা শ্মশানঘাটে দাহের সময়ও তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শ্মশানে একাধিক দেহ দাহের অপেক্ষায় থাকলেও আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের দেহকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত দাহ করা হয়েছিল। দাহের নির্ধারিত খরচও পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। আরজি করের নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে পানিহাটির একটি স্মরণসভায় এই দাহ-পর্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। পানিহাটির শ্মশানঘাটে সে দিন কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখতে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরেই খড়দহ থানায় নতুন এফআইআর দায়ের হয়। অভিযোগে নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
নির্মলের রাজনৈতিক পরিচয়
নির্মল ঘোষ, স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ‘নান্টু’ নামে পরিচিত, পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে পর পর তিন বার তৃণমূলের বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি। তাঁর পরিবর্তে তৃণমূল তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে প্রার্থী করে। তবে নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন তীর্থঙ্কর। এর আগে তীর্থঙ্করের বিরুদ্ধেও তোলাবাজি, বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন এবং লটারির টিকিট হাতিয়ে নেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ ওঠে। গত ১৩ জুলাই দক্ষিণেশ্বর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
তীর্থঙ্কর গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই নির্মল ঘোষের অবস্থান নিয়ে জল্পনা চলছিল। জুলাই মাসে তৃণমূলের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের একটি বৈঠকে তাঁকে দেখা গেলেও ওই শিবিরের তরফে দাবি করা হয়েছিল, তাঁকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তিনি নিজেই সেখানে এসেছিলেন। নির্মলও পরে দাবি করেছিলেন, তিনি বৈঠকে যোগ দিতে যাননি; কসবার বিধায়ক জাভেদ খানের সঙ্গে দেখা করতেই সেখানে গিয়েছিলেন।
নতুন এফআইআর দায়েরের পর ওড়িশায় তাঁর আত্মগোপন এবং সেখান থেকে গ্রেফতারি আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য—মৃতদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগের নেপথ্যে কারা ছিলেন এবং ওই ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য কাজ করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.