নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের পর তিন দিন কেটে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা। শনিবার রাত পর্যন্ত নেপালে ৬৬৯ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনও নিখোঁজ অন্তত ২,৩৬২ জন। ধ্বংসস্তূপ ও কাদামাটির স্তূপের নীচে আরও বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতীয়দের নিয়েও উদ্বেগ কাটেনি। শনিবার সন্ধ্যায় নেপাল পর্যটন পর্ষদ জানিয়েছিল, ১৬৭ জন ভারতীয় পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১৮৩ জনের এখনও খোঁজ নেই। পরে রাতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, ১০৮ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আরও ৫০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা গিয়েছে। তবে এখনও ২৭৫ জন ভারতীয় নিখোঁজ। পাশাপাশি ১২৮ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূতেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, নেপাল হয়ে চিনের দিকে যাওয়া ভারতীয়দের মধ্যেও অনেকে নিরাপদে ফিরেছেন। মোট ৫৯৮ জন চিন থেকে আবার নেপালে ফিরে এসেছেন। তিব্বত-চিনের দিকে থাকা আরও প্রায় ৯০০ ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বেজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাস। তাঁরা নিরাপদে রয়েছেন বলেই জানানো হয়েছে। হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির মধ্যে অন্যতম নুয়াকোট। সেখানে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে বহু শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের উদ্ধারে নেপালের সেনা ও পুলিশ যৌথ ভাবে অভিযান চালাচ্ছে।
নেপাল প্রশাসনের ৮২ সদস্যের একটি দল শুক্রবার রাত থেকেই উদ্ধারকাজ শুরু করেছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট কঠিন হয়ে উঠেছে। এই কাজে সাহায্য করতে ভারতও একাধিক দল পাঠাচ্ছে। শুক্রবার ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল নুয়াকোটে পৌঁছয়। শনিবার থেকে তারা উদ্ধারকাজে নামে। দলের সদস্যদের মধ্যে সুড়ঙ্গ থেকে মানুষ উদ্ধারে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসাকর্মীরাও রয়েছেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, আরও একটি সুড়ঙ্গ খনন ও উদ্ধার অভিযানে দক্ষ দল নেপালের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। পাশাপাশি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দলও কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করবেন তাঁরা।

নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটের অনুকূল পোদ্দার ও রেবা পোদ্দারের বেঁচে ফেরার ঘটনাও সামনে এসেছে। নেপাল থেকে তাঁরা বিহার হয়ে বাংলার পথে রওনা দিয়েছেন। রক্সৌল থেকে মিথিলা এক্সপ্রেসে চেপে হাওড়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তাঁরা। রবিবার ভোরে তাঁদের হাওড়ায় পৌঁছনোর কথা। একটি ভ্রমণ সংস্থার দাবি, ওই দম্পতির সঙ্গে আরও ১০ জন নেপাল থেকে ফিরছেন। তাঁদের মধ্যে সংস্থার দুই কর্মীও রয়েছেন। বুধবার বিপর্যয়ের ঠিক আগে তিব্বত সীমান্তের অভিবাসনকেন্দ্র থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে ছিল তাঁদের বাস। আচমকাই বাস থামিয়ে দেন চালক। তিনি হড়পা বানের খবর পেয়ে আর এগোতে চাননি। সঙ্গে সঙ্গে বাস ঘুরিয়ে কাঠমান্ডুর দিকে রওনা দেন।
আরও পড়ুন,
গর্জন করে গিরিখাত বেয়ে ধেয়ে আসছিল হড়পা বান, চালকের বুদ্ধিতে প্রাণে বাঁচলেন বসিরহাটের পোদ্দার দম্পতি
অনুকূলের কথায়, কিছুক্ষণ পর তাঁরা দেখতে পান গিরিখাত বেয়ে মেঘের মতো বিশাল কিছু ধেয়ে আসছে। শোনা যাচ্ছিল প্রবল গর্জন। স্থানীয় মানুষজনও আতঙ্কে উপরের দিকে ছুটছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই যে জায়গায় তাঁদের বাস দাঁড়িয়েছিল, সেই এলাকা জলের তোড়ে ভেসে যায়।

অর্থাৎ, চালকের সামান্য সময়ের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়।
নেপাল থেকে ইতিমধ্যে তামিলনাড়ুর ২১ জন পর্যটক ভারতে ফিরেছেন। চেন্নাই বিমানবন্দরে নামার পরও তাঁদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ছিল। পর্যটকদের কয়েক জন জানিয়েছেন, কী ভাবে তাঁরা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। পর্যটক বিজয় ভুবনেশ্বরী জানিয়েছেন, তাঁরা বোমা বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ শব্দ শুনেছিলেন। তার পরেই বিশাল কাদা ও পাথরের স্রোত তাঁদের কনভয়ের বাসগুলির উপর আছড়ে পড়ে।
আরও পড়ুন,
নেপালে এখনও নিখোঁজ ২৮৭ ভারতীয়, উদ্ধার ৮৮ জন, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পৌঁছচ্ছে দ্বিতীয় দল
হড়পা বানে নেপালের রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই এলাকা থেকে শনিবার আরও চার ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। উদ্ধার হওয়া চার জন হলেন—রিপু কুমার, চানেশ্বর নারজ়ারি, কৃপা শঙ্কর এবং মহম্মদ মিনহাজুদ্দিন। তাঁদের কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে তাঁদের ভারতে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে। তবে তাঁরা ভারতের কোন এলাকার বাসিন্দা, তা এখনও জানা যায়নি। বিপর্যয়ের পর থেকেই নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সাহায্যের জন্য নয়াদিল্লি বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এখনও পর্যন্ত নেপালে ৫৭.৬ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে বলে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে।

প্রথম দিকে বিদেশি সাহায্য গ্রহণে আপত্তি থাকলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে পরে আন্তর্জাতিক সাহায্যে সম্মতি দেয় নেপাল। ভারতের সহযোগিতার জন্য নেপাল সরকার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। দিল্লির সহযোগিতাকে মোদীর ‘উদারতা’ বলেও উল্লেখ করেছে কাঠমান্ডু। শনিবার বিকেল পর্যন্ত আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে বিপজ্জনক এলাকা থেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
নেপালের পাশাপাশি একই হড়পা বানের প্রভাব পড়েছে তিব্বতেও। পাহাড় থেকে নেমে আসা জল, কাদা ও পাথরের স্রোতে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়েছে। তবে চিনের দিকের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এখনও খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। চিন সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত পাঁচ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে। সরকারি হিসাবে নিখোঁজ ৫৫৮ জন, যাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। তবে এর বাইরে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। চিনা সমাজমাধ্যমে বিপর্যয়ের ছবি ও ভিডিয়োও কার্যত দেখা যাচ্ছে না। আগে প্রকাশিত কিছু ছবি ও ভিডিয়ো সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার, বিপর্যয়ের তিন দিন পর, চিনের ২১ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরং অভিবাসন দফতরে পৌঁছয়। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পায় চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। চিনা উদ্ধারকারী দলের সদস্য জ়োউ মিঙ্কির দাবি, দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে তাঁরা গিরংয়ে পৌঁছেছেন। কিন্তু যত দূর চোখ গিয়েছে, দেখা গিয়েছে ধ্বংসের চিহ্ন। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হড়পা বান যখন গিরং সীমান্তের অভিবাসন দফতরে আছড়ে পড়ে, তখন সেখানে প্রায় ১৩০ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৫০ জনেরও বেশি ভারতীয় তীর্থযাত্রী ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁরা কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর এখনও বহু মানুষের কোনও খোঁজ নেই। উদ্ধারকারী দলগুলি ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি ও দুর্গম সুড়ঙ্গে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.