বর্ষার মরসুমে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া কিংবা ভাইরাল জ্বরের পাশাপাশি আরও একটি সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে চিকিৎসক মহলে। সেটি হল চাঁদিপুরা ভাইরাস (Chandipura Virus বা CHPV)। এটি অত্যন্ত বিরল হলেও সংক্রমণের পর খুব দ্রুত গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে প্রাণঘাতী পরিস্থিতির কারণ হতে পারে। তাই বর্ষাকালে শিশুদের জ্বরকে কখনওই অবহেলা না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী এই চাঁদিপুরা ভাইরাস?
চাঁদিপুরা ভাইরাস র্যাবডোভিরিডা (Rhabdoviridae) পরিবারের অন্তর্গত একটি ভাইরাস। ১৯৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের চাঁদিপুরা এলাকায় প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছিটেফোঁটা সংক্রমণ দেখা গেলেও বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা যায়।

এই ভাইরাসের সংক্রমণে অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোম (AES) বা মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে রোগীর অবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।
কীভাবে ছড়ায়?
চাঁদিপুরা ভাইরাস সাধারণ সর্দি-কাশির মতো একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায় না। এর প্রধান বাহক হল স্যান্ডফ্লাই নামে পরিচিত এক ধরনের ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকা। আক্রান্ত স্যান্ডফ্লাই কামড়ালে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বর্ষাকালে এই পোকার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সংক্রমণের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
কোন লক্ষণগুলি দেখলে সতর্ক হবেন?
চাঁদিপুরা ভাইরাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, সংক্রমণের পর খুব দ্রুত উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথম দিকে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে তা গুরুতর আকার নিতে পারে।
প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে—
*হঠাৎ উচ্চ জ্বর
*তীব্র মাথাব্যথা
*বারবার বমি
*শরীর ভেঙে যাওয়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা
*পেশিতে ব্যথা
*অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব
*অস্থিরতা বা আচরণে পরিবর্তন
*খিঁচুনি*জ্ঞান হারিয়ে ফেলা
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বরের সঙ্গে যদি খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ বা শিশুকে অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়তে দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
এই ভাইরাসে মূলত ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে ১০ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি বলে মনে করা হয়। কারণ, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি পরিণত হয় না এবং বাইরে খেলাধুলার সময় স্যান্ডফ্লাইয়ের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।
কেন এই ভাইরাস এত উদ্বেগের?
চাঁদিপুরা ভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল এর দ্রুতগতির সংক্রমণ। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মস্তিষ্কে প্রদাহ শুরু হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবনহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়।
এছাড়া এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা অনুমোদিত টিকা নেই। ফলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ ডেঙ্গি, জাপানিজ এনসেফালাইটিসসহ আরও কয়েকটি ভাইরাসজনিত রোগের সঙ্গে এর লক্ষণের মিল রয়েছে।
রোগ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা হতে পারে—
*আরটি-পিসিআর (RT-PCR) পরীক্ষা
*অ্যান্টিবডি পরীক্ষা
*প্রয়োজনীয় বিশেষ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা
চিকিৎসা কী?
চাঁদিপুরা ভাইরাসের নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় চিকিৎসা মূলত রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
*জ্বর নিয়ন্ত্রণে ওষুধ
*খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা
*শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা
*প্রয়োজনে অক্সিজেন বা আইসিইউ-তে নিবিড় পর্যবেক্ষণ
*দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা গেলে জটিলতা মোকাবিলার সম্ভাবনা বাড়ে।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
যেহেতু স্যান্ডফ্লাইয়ের কামড়ের মাধ্যমেই এই ভাইরাস ছড়ায়, তাই প্রতিরোধের জন্য কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
*শিশুদের জন্য নিরাপদ ইনসেক্ট রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন।
*রাতে অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে ঘুমান।
*শিশুদের হাত-পা ঢাকা পোশাক পরান।
*বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন।
*আবর্জনা ও পোকামাকড়ের বংশবিস্তার হতে পারে এমন স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
*জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি, বমি বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
চাঁদিপুরা ভাইরাস খুব বেশি দেখা না গেলেও এর সংক্রমণ হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে। তাই বর্ষাকালে শিশুদের জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ ভেবে অবহেলা না করে সতর্ক থাকা জরুরি। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সময়মতো হাসপাতালে চিকিৎসা এবং স্যান্ডফ্লাইয়ের কামড় থেকে সুরক্ষাই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.