দিনের শেষে ঘর মানেই আশ্রয়—ক্লান্ত শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেওয়ার জায়গা। কিন্তু সেই ঘর যদি একেবারে ফাঁকা, নিখুঁত ও নিরাবেগ হয়, তবে অনেকের কাছেই তা আরাম নয়, বরং এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করে। এই মনোভাব থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এক নতুন অন্দরসজ্জা প্রবণতা—‘ক্লাটারকোর’।
এই ধারায় ঘরকে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে তোলার বদলে, নিজের জীবনের নানা স্মৃতি, প্রিয় জিনিস ও অনুভূতিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখাই হয়ে উঠছে এক বিশেষ নান্দনিকতা। দেখতে অগোছালো হলেও, এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ব্যক্তিত্ব ও আবেগের ছাপ।
মিনিমালিজম বনাম ক্লাটারকোর
গত কয়েক বছর ধরে ‘মিনিমালিজম’ বা সংক্ষিপ্ত সাজসজ্জা ছিল ট্রেন্ডে। সেখানে কম জিনিস, ফাঁকা জায়গা এবং নিরপেক্ষ রঙের ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হত।
কিন্তু ‘ক্লাটারকোর’ ঠিক তার উল্টো। এখানে মূল মন্ত্র—“বেশি হলেও সমস্যা নেই, যদি তা আপন মনে লাগে।”
এই ধারা বলে, ঘর শুধু দেখানোর জন্য নয়, অনুভব করার জন্য। তাই ঘরে থাকবে বই, পুরনো ছবি, স্মৃতিচিহ্ন, ছোটখাটো সংগ্রহ—সব মিলিয়ে এক ব্যক্তিগত জগৎ।
কীভাবে তৈরি করবেন ক্লাটারকোর ঘর?
এই সাজসজ্জার মূল দর্শন—“সযত্নে অযত্ন”। অর্থাৎ, সব কিছু পরিকল্পনা করে সাজালেও তা যেন স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়।
কিছু সহজ উপায়:
দেওয়ালে বিভিন্ন সময়ের ছবি সাজিয়ে রাখা
প্রিয় বইগুলো একসঙ্গে রেখে ছোট লাইব্রেরির অনুভূতি তৈরি
পুরনো ক্যাসেট, সিডি বা সংগ্রহযোগ্য জিনিস প্রদর্শন
সোফায় ছড়ানো কুশন বা হালকা অগোছালো কাপড়
ঘরের কোণে পুরনো চেয়ার বা স্মৃতিবাহী আসবাব রাখা
এইসব উপাদান মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক পরিবেশ, যা নিখুঁত না হলেও গভীরভাবে ব্যক্তিগত।
‘লিভড-ইন’ অনুভূতি: ক্লাটারকোরের প্রাণ
এই স্টাইলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল—ঘর যেন জীবন্ত মনে হয়।
যেমন:
জানলার ধারে রাখা চেয়ার, তার উপর আলগা কম্বল
টেবিলে খোলা বই ও কফির কাপ
পাশে রাখা বুকমার্ক বা চশমা
দেখলে মনে হবে, কেউ যেন একটু আগেই উঠে গিয়েছে। এই ‘লিভড-ইন’ অনুভূতিই ঘরকে আরও মানবিক করে তোলে।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে এই ট্রেন্ড?
১. মানসিক স্বস্তি ও সুরক্ষা
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রিয় জিনিসে ঘেরা পরিবেশ মানুষকে মানসিকভাবে নিরাপদ অনুভব করায়।
ফাঁকা ঘর একাকিত্ব বাড়ালেও, স্মৃতিতে ভরা ঘর সেই শূন্যতা কমায়।
২. ব্যক্তিগত স্বাধীনতা
এই সাজে কোনও কঠোর নিয়ম নেই। নিজের পছন্দ অনুযায়ী বদলানো যায়, যা এটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
৩. স্মৃতির সংযোগ
প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি গল্প। ফলে ঘর হয়ে ওঠে এক ব্যক্তিগত স্মৃতির জার্নাল।
অগোছালো মানেই নোংরা নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—
ক্লাটারকোর মানে অগোছালো, কিন্তু কখনওই অপরিচ্ছন্ন নয়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে, শুধু জিনিসগুলিকে নিখুঁতভাবে গুছিয়ে না রাখাই এই স্টাইলের আসল কথা।
তবে অতিরিক্ত জিনিস বা বিশৃঙ্খলা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তা মানসিক চাপও বাড়াতে পারে—বিশেষ করে যাঁদের উদ্বেগের সমস্যা আছে।
শেষ কথা
‘ক্লাটারকোর’ আসলে শুধু একটি সাজসজ্জার ধরন নয়, বরং এক মানসিক অবস্থার প্রতিফলন।
এটি শেখায়—নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়, নিজের মতো হওয়াই আসল।
একাকিত্বের এই সময়ে, যেখানে মানুষ নিজস্ব জগৎ খুঁজছে, সেখানে অগোছালো ঘরই হয়ে উঠছে সবচেয়ে আরামদায়ক আশ্রয়।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.